ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাতভর ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং প্রায় ৯০ জন আহত হয়েছেন। কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো একে রাজধানীর ওপর চালানো ‘এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলা’ বলে উল্লেখ করেছেন। খবর বিবিসির।
তিনি জানান, হামলায় একটি অ্যাম্বুলেন্স স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতদের স্মরণে শুক্রবার কিয়েভে শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে।
যদিও অতীতের কিছু হামলায় নিহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল, তবে এবারের হামলায় রাজধানী কিয়েভের ওপর একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় আঘাত হানা হয়েছে।
শহরজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ
হামলার সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের পর একাধিক আবাসিক এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করেছিলেন যে রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইউক্রেনের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো জানান, হতাহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ আবারও ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ হামলায় দক্ষিণ-পূর্ব কিয়েভের একটি বহুতল আবাসিক ভবনের বড় অংশ ধসে পড়ে। মেয়র ক্লিচকো জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা কাজ করছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী ও তার পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন।
এছাড়া কিয়েভের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দারনিতস্কি জেলায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে।
একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি কিন্ডারগার্টেনের পাশে বিস্ফোরিত হয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি করে। আশপাশের ভবনগুলো আগুনে পুড়ে যায় এবং বহু বারান্দা ও কাঠামো বেঁকে যায়।
অন্য ক্ষেপণাস্ত্রটি নয়তলা একটি আবাসিক ভবনের এক প্রান্তে আঘাত করলে ভবনের একটি অংশ পুরোপুরি ধসে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, কয়েকজন মানুষ ভবনের বেজমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বজনরা ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আক্রান্ত ভবনের পাশের বাসিন্দা স্বিতলানা বলেন, বিমান হামলার সতর্ক সংকেতের সময় তিনি করিডোরে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরপর বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন।
তিনি বলেন, ভয় লাগেনি। কারণ এর আগেও এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি। তিনি জানান, এর আগে রাশিয়ার আরেকটি হামলায় তার মা নিহত হন এবং তিনি নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। দুই বছর পর যুদ্ধে ইউক্রেনের হয়ে লড়াই করতে গিয়ে তার ছেলেও নিহত হন।
আরেক বাসিন্দা ওলেক্সি, যার মুখ কাচের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে যায়, বলেন প্রথম বিস্ফোরণের পর তিনি বাইরে বের হয়েছিলেন। এরপর দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে উড়ে আসা কাচে তিনি আহত হন।
তিনি বলেন, এটি ইউক্রেনের হামলার জবাব নয়। যুদ্ধ শুরু করেছে রাশিয়াই। এটি একটি আবাসিক এলাকা এবং তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই এখানে হামলা চালিয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কিয়েভে হামলাটি প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে কয়েকটি ধাপে চলে।
প্রথমে ড্রোন হামলায় শহরের ঐতিহাসিক এলাকায় একটি হোটেলে আগুন লাগে। রাত ১টার দিকে রাশিয়া একযোগে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এরপর রাত ৩টার দিকে আবারও একাধিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। সবশেষে ভোর পর্যন্ত রাজধানীজুড়ে ড্রোন হামলা চলতে থাকে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার হামলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন কিয়েভের বাসিন্দারা। তাদের মতে, হামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রতিটি হামলা এখন দীর্ঘস্থায়ী, আরও শক্তিশালী এবং বিস্তৃত এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, এক রাতে রাশিয়া ৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৯৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ২৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২টি ড্রোন কিয়েভসহ ৩৩টি স্থানে আঘাত হানে।
ইউক্রেনের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একযোগে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত করে দেয়ার যে কৌশল রাশিয়া গ্রহণ করেছে, তা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
