গাজায় গণহত্যা, তবু ইসরাইলকে নিয়ে ইইউ’র দ্বিচারিতা

গাজায় গণহত্যা, তবু ইসরাইলকে নিয়ে ইইউ’র দ্বিচারিতা

ফন্ট সাইজ:

গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে লাভজনক চুক্তি করে যাচ্ছে। স্টেটওয়াচের সংগৃহীত তথ্য এবং আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ইইউভুক্ত দেশগুলোর সরকারি সংস্থাগুলো ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্তত ১৯৪টি চুক্তি করেছে, যার মোট মূল্য প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রকাশ্য নথিতে সব চুক্তির তথ্য নেই। কিছু চুক্তির মূল্য এক ইউরো বা তারও কম দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পরই বেড়েছে চুক্তির সংখ্যা
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২১ মাসে ৮২টি চুক্তি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোর বেশি।
অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী ২১ মাসে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১১২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মোট মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো।

সমালোচক হয়েও স্পেনের বড় অস্ত্র-চুক্তি
ইসরাইলের সবচেয়ে কড়া ইউরোপীয় সমালোচকদের অন্যতম স্পেনও এই তালিকায় রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত স্পেন ১৪টি চুক্তি করেছে, যার মোট মূল্য প্রায় ২২ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চুক্তিটি হয় ২০২৪ সালের এপ্রিলে। স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইসরাইলের রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের সঙ্গে ২০ কোটি ৭০ লাখ ইউরো মূল্যের একটি “আকাশযুদ্ধ ব্যবস্থা” কেনার চুক্তি করে।
এ ছাড়া স্পেনের পুলিশ বাহিনী ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান মারোম ডলফিন থেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটও কিনেছে।

সবচেয়ে বেশি চুক্তি করেছে হাঙ্গেরি
ইউরোপে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হাঙ্গেরি সবচেয়ে বেশি চুক্তি করেছে। দেশটি ৪২টি চুক্তি করেছে, যার মোট মূল্য প্রায় ৬০ কোটি ৩০ লাখ ইউরো। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া প্রথম পশ্চিম ইউরোপীয় দেশ সুইডেন কিংবা ফিলিস্তিনের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন জানানো স্পেন- কোনো দেশই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসরাইলি কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য ও সেবা কেনা বন্ধ করেনি।

জার্মানিরও বড় কেনাকাটা
ইসরাইলের অন্যতম প্রধান সমর্থক জার্মানির সরকারি সংস্থাগুলোও ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম, সাইবার নিরাপত্তা সফটওয়্যার, গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি এবং চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কিনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মান সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইসরাইলি কোম্পানির ৩৭টি চুক্তির তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এসব চুক্তির অনেকগুলোর আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি। আবার কিছু চুক্তির মূল্য মাত্র এক ইউরো কিংবা এক সেন্ট উল্লেখ করা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

জার্মানির অর্থনীতি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন অনুযায়ী ইসরাইলি কোম্পানিগুলোও অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানের মতোই সরকারি দরপত্রে অংশ নিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন প্রতিটি ক্ষেত্রে পৃথকভাবে পর্যালোচনা করে দেয়া হয় এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও পুলিশও চুক্তি করেছে
শুধু প্রতিরক্ষা খাত নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও পুলিশ সংস্থাও ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। স্পেনের পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অব মাদ্রিদ ২০২৪ সালের আগস্টে প্রায় ৩ লাখ ইউরো মূল্যের কোয়ান্টাম কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ইসরাইলি কোম্পানি হেকাপলের সঙ্গে দুটি চুক্তি করে।
বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি হসপিটাল লুভেন ২০২৪ সালের এপ্রিলে জিএনএক্স ডেটা সিস্টেমসের সঙ্গে ১২ লাখ ইউরো মূল্যের জিনোম সিকোয়েন্সিং সফটওয়্যার কেনার চুক্তি করে।

বেলজিয়ামের জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানওরেস ইসরাইলি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি সিসএইড টেকনোলজিসের সঙ্গে ৩৭ লাখ ইউরোর বেশি মূল্যের চুক্তি করেছে।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের মার্চে ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান সোর্স ভাগাবন্দ সিস্টেমসের থেকে প্রায় ৪০ লাখ ইউরো মূল্যের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট কেনার চুক্তি করে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত স্পেন ও জার্মানির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্পেনের পুলিশ বাহিনী এ বিষয়ে আল জাজিরার প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) চলমান মামলার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গাজায় গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলা চলছে।
২০২৪ সালে আইসিজে রায়ে বলেছিল, ফিলিস্তিনিদের অপূরণীয় ক্ষতির “বাস্তব ও আসন্ন ঝুঁকি” রয়েছে এবং সব রাষ্ট্রের উচিত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি অবৈধ উপস্থিতিকে কোনোভাবেই সহায়তা বা সহজতর না করা।
অস্ট্রিয়ার সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইউসুফ আল-তামিমি আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইলের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান নীতি “আইনগতভাবে টেকসই নয়”।

তার ভাষায়, আইসিজের রায় অনুযায়ী, ফিলিস্তিনে অবৈধ দখলদারিত্বের প্রভাব দূর করতে সব রাষ্ট্রেরই ব্যবস্থা নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং এই বাধ্যবাধকতা ইইউ সদস্য দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য।

ইইউ-ইসরাইল বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের দাবি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪ সালে দুই পক্ষের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো।
বিশ্লেষকদের মতে, ইইউ চাইলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে ইসরাইলের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, ইইউর কূটনৈতিক শাখা ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তেলআবিব ইইউ-ইসরাইল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তির মানবাধিকার সংক্রান্ত ধারা লঙ্ঘন করেছে।

ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও বলেছেন, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার মতো ইসরাইলের পদক্ষেপ “আত্মরক্ষার সীমা অতিক্রম করেছে”।
তবে জার্মানি ও ইতালিসহ কয়েকটি দেশ এই চুক্তি স্থগিতের বিরোধিতা করায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক সংস্থা ইইউ-ইসরাইল চুক্তি স্থগিতের দাবি জানিয়েছে। অ্যামনেস্টির ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কার্যালয়ের পরিচালক ইভ গেডি বলেন, চুক্তির মৌলিক মানবাধিকার ধারা লঙ্ঘিত হলে সেটি স্থগিত করা আইনি বাধ্যবাধকতা।

তার ভাষায়, ইসরাইলের অবৈধ কর্মকাণ্ডের শুধু মৌখিক নিন্দা জানিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়া আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করছে। লজ্জাজনকভাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরাইলকে কার্যত দায়মুক্তির মধ্যেই এসব লঙ্ঘন চালিয়ে যেতে দিয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন