কাগজে-কলমে দুই অসম শক্তি। কিন্তু মাঠে গড়ালো এক হাই-অকটেন লড়াই! যেখানে শুরুতে চমক দেখায় কঙ্গোলিজরা। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপ খেলতে আসা সাব-সাহারান দলটি কাঁপিয়ে দেয় পরাক্রমশালী ইংল্যান্ডের জাল। তবে ইংলিশদের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দিলেন না ‘মিস্টার ক্যাপটেন’। হ্যারি কেইনের ১১ মিনিটের ঝড়! জোড়া গোল করে ভেঙে দিলেন ফুটবল লিজেন্ড পেলের এক রেকর্ড, আর দলকে তুলে নিলেন শেষ ষোলোতে। গতকাল বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর রোমাঞ্চকর ম্যাচে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোকে (ডিআর কঙ্গো) ২-১ গোলে হারায় ইংল্যান্ড। জর্জিয়ার আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও অধিনায়ক হ্যারি কেইনের দুর্দান্ত জোড়া গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে থ্রি লায়নরা। পরবর্তী রাউন্ডে তারা সহ-আয়োজক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে।
ম্যাচ শেষে গ্যালারিজুড়ে ইংলিশ সমর্থকরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন ‘ইটস কামিং হোম’। তবে ম্যাচের বেশির ভাগ সময় বেসুরো সময়ই কাটান ইংলিশরা! ম্যাচের সপ্তম মিনিটে গোল হজম করে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের চতুর্থ সেরা দল ইংল্যান্ড। ৭৫তম মিনিট পর্যন্ত লিড ধরে রাখে দীর্ঘ কঙ্গোলিজরা। জমাট রক্ষণ ও গোলরক্ষকের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে বড় স্বপ্ন দেখছিল তারা নিশ্চিত। পরিসংখ্যানও ইংলিশদের চোখ রাঙাচ্ছিল। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতেছিল ইংল্যান্ড। এরপর দীর্ঘ ৬০ বছর কেটে গেছে, কিন্তু বিশ্বকাপে প্রথমে গোল হজম করার পর আর কোনো ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়তে পারেনি থ্রি-লায়নরা। তবে এসময় দৃশ্যপটে আগমন হ্যারি কেইনের। ১১ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল আদায় করেন ইংলিশ অধিনায়ক। এতে বিশ্বকাপে গোলদাতার তালিকায় ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে যান তিনি। বিশ্বকাপে ১২ গোল করেছেন ফুটবলের কালো মানিক। কেইনের গোলসংখ্যা এখন ১৩। ডেভিড ব্যাকহ্যামের পর দ্বিতীয় ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে তিনটি পৃথক বিশ্বকাপে গোলের কৃতিত্ব দেখালেন কেইন।
ম্যাচের শুরুতেই সবাইকে চমকে দিয়ে ম্যাচের ৭ম মিনিটে লিড নেয় ডিআর কঙ্গো। দলের তারকা ডিফেন্ডার চ্যান্সেল এমবেম্বার বাড়ানো নিখুঁত পাস থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডি-বক্সের ভেতর দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করেন ব্রায়ান সিপেঙ্গা। এই আকস্মিক ধাক্কা কাটিয়ে ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধের ২৯ মিনিটে ডেক্লান রাইসের ক্রস থেকে জুড বেলিংহামের এক বুলেট হেড কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি দুর্দান্ত রিফ্লেক্সে রুখে দেন। বিরতির ঠিক আগে ৪২ মিনিটে কঙ্গোর ইওয়ান উইসার শট গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসলে ব্যবধান দ্বিগুণ করা থেকে বঞ্চিত হয় আফ্রিকান দলটি। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেই প্রথমার্ধ শেষ করে ইংল্যান্ড।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার বাড়াতে মার্কাস রাশফোর্ড এবং ননি মাদুয়েকের পরিবর্তে বুকায়ো সাকা ও অ্যান্থনি গর্ডনকে মাঠে নামান ইংলিশ কোচ। ম্যাচের ৭৪তম মিনিটে কাক্সিক্ষত গোলের দেখা পায় ইংল্যান্ড। সতীর্থের ক্রসে চমৎকার শটে গোল করে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান হ্যারি কেইন। সমতা ফেরানোর ঠিক ১১ মিনিট পর, অর্থাৎ ৮৫তম মিনিটে আবারো জ্বলে ওঠেন কেইন। ঠান্ডা মাথায় নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোলটি করে ইংল্যান্ডের ২-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন এই তারকা স্ট্রাইকার। ডিআর কঙ্গো ম্যাচজুড়ে দারুণ শারীরিক ফুটবল এবং রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা দেখালেও শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেইনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের কাছে পরাস্ত হতে হয় তাদের। এবারের আসরে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা কেইন। নরওয়ের আর্লি ব্রট হালান্দ ও কেইনের ঝুলিতে সমান ৫ গোল। ৬টি করে গোল নিয়ে তালিকার শীর্ষে মেসি ও এমবাপ্পে।
কেইনের জোড়া গোল নিয়ে সহঅধিনায়ক ডেকলান রাইস বিবিসি রেডিওকে বলেন, ‘সে সুযোগ পাবেই। আর আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, আপনি যদি তাকে একটা সুযোগও দেন, সে সেটাকে গোলে রূপান্তর করবে। আমি অসংখ্যবার এটা ঘটতে দেখেছি। সে যত গোল করে এবং যেভাবে গোলগুলো করে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। গোল করার পেছনে তার যে মানসিকতা, চলতি মৌসুমে ইতিমধ্যেই সে ৭২টি গোল করে ফেলেছে, এটা স্রেফ অবিশ্বাস্য। তাই এর সব কৃতিত্ব তারই।’
১৯৭৪ বিশ্বকাপে জায়ার নামে অংশ নেয় দেশটি। ওই আসরে ১৪ গোল হজম করে তারা। গোল দিতে পারেনি একটিও। তবে এবার তারা ফুটবলভক্তদের মন কেড়ে নিশ্চিত। ৫২ বছর আগে ‘জায়ার’ নামে বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে সামরিক শাসকের হুমকিতে পড়েন কঙ্গোর ফুটবলাররা। অর্ধশতাব্দী পরেও সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি। পূর্ব কঙ্গো যুদ্ধ আর মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে নকআউটে তুলে নেয়া তারকা ইয়োয়ানে উইসা বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার যোগ্যতা আমরা অর্জন করেছি। শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ভিন্ন একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে। এ ধরনের ম্যাচ উপভোগ করা উচিত। আপনারা জানেন, আমাদের দেশের পরিস্থিতি কেমন। পূর্ব কঙ্গোতে যুদ্ধ চলছিল। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ যখন আমরা জার্সিটা পরি, তাদের কথাই মনে পড়ে। সুতরাং, যা কিছুই হোক আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
আটলান্টায় ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত দেখানোর ব্যাপারে ম্যাচ শেষে বিবিসি রেডিওকে ইংল্যান্ড ফুটবল দলের সহ-অধিনায়ক ডেকলান রাইস বলেন, ‘৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় খেললে এমনটাই হওয়ার কথা। বেশ কঠিন ম্যাচ ছিল। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়েছি এবং এই ম্যাচে আমাদের শরীরকে অনেক ধকল পোহাতে হয়েছে। এখন বিশ্রাম নিয়ে আবার মাঠে নামার পালা।’
ডেকলান বলেন, ‘এটি একটি নকআউট পর্বের ম্যাচ। তারা একটি কঠিন গ্রুপ পার করে এসেছে এবং ম্যাচটি যে কোনোভাবেই সহজ হতো না, তা বলাই বাহুল্য। একজন দর্শক বা একজন খেলোয়াড় হিসেবে আপনি কখনোই প্রতিপক্ষকে খাটো করে দেখতে পারেন না, কারণ তাদের সেই মান বা যোগ্যতা আছে এবং যেকোনো মুহূর্তে তারা আপনাকে ভড়কে দিতে পারে। আজ তারা সেটাই করেছে। তবে এটুকু বাদ দিলে আমি মনে করি আমরা অনেক সুযোগ তৈরি করেছিলাম।’
ম্যাচে ৫৪% বল পজিশন রেখে ১৬টি শট নেয় ইংল্যান্ড। ৮টি শট ছিল অনটার্গেটে। কঙ্গোর গোলরক্ষক দুর্দান্ত কয়েকটি সেভ করেন।
ডেকলান বলেন, ‘তাদের গোলরক্ষককে কৃতিত্ব দিতেই হয়, সে আজ অবিশ্বাস্য কিছু সেভ করেছে। আর হ্যারি কেইন তো অবধারিতভাবেই গোল করার জন্য প্রস্তুত থাকে। এটা আমাদের একটা প্রাপ্য জয় ছিল, তবে যতটা সহজে জেতা উচিত ছিল, কাজটা আমরা তার চেয়ে একটু বেশি কঠিন করে ফেলেছিলাম। আসল কথা হলো, নকআউটে ম্যাচ জেতাটাই মূল বিষয় এবং আমরা সেটাই করেছি।’
