বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত বেইজিং সফরের সময় চীনের পক্ষ থেকে তিস্তা নদী উন্নয়ন প্রকল্পে বহু বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনায় সমর্থন দেয়ার ঘোষণা শুধু বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় নয়, এটি ভারতের পাশাপাশি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করতে ভারতের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং চাপ প্রয়োগ করে এসেছে। কিন্তু প্রথমে কংগ্রেস এবং পরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারগুলো এমন কোনো চুক্তি করতে পারেনি।
এখন নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ কার্যত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তিস্তা নদীকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও আধুনিকায়নের জন্য তারা আর অপেক্ষা করবে না। বরং যে দেশ এই পরিকল্পনায় অর্থায়ন ও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকবে, বাংলাদেশ তার সঙ্গেই এগিয়ে যাবে।
স্বল্পমেয়াদে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্প ভারতের স্বার্থের সরাসরি ক্ষতি করবে বলে মনে হয় না। কারণ ভারত উজানের দেশ এবং বাংলাদেশ এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়ার ঝুঁকি নেবে না, যা নয়াদিল্লিকে এমন ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করতে পারে, ফলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তবে এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। এটি এমন একটি বার্তা বহন করে, যা নয়াদিল্লি কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর উপেক্ষা করা উচিত নয়।
তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে ভারত নয়, চীনকে বেছে নিয়েছেন- এটিও একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা। ঢাকা ও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য ব্রহ্মপুত্র নদ-সংক্রান্ত কৌশলগত হিসেবেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ব্রহ্মপুত্রে ভারত নিজেই ভাটির দেশ। তিস্তা চুক্তি আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে- আন্তর্জাতিক নদীগুলো আধুনিক ভূরাজনীতিতে দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পূর্ব সীমান্তে ব্রহ্মপুত্র নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আগে থেকেই সংবেদনশীল। অন্যদিকে পশ্চিমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগের জবাবে সিন্ধু পানি চুক্তিকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। ভারত এখনো পাকিস্তানের দিকে পানিপ্রবাহ বন্ধ করেনি। তবে তারা ঘোষণা দিয়েছে যে, আর সিন্ধু পানি চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলবে না। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে পানিবণ্টনের বিষয়টি কার্যত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম- উভয় সীমান্তেই স্থিতিশীল পানিবণ্টন ব্যবস্থা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ পানি শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একই সঙ্গে সফট পাওয়ার এবং হার্ড পাওয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই এই কৌশলগত সম্পদকে অবহেলা বা অপচয় করার সুযোগ কোনো রাষ্ট্রেরই নেই।
