‘ঘৃণা নয়, সংহতিই জিতেছে’

হোলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর

‘ঘৃণা নয়, সংহতিই জিতেছে’

ফন্ট সাইজ:

দশ বছর আগে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীল ও বিভক্ত রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার যে চেষ্টা হয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশি-বিদেশি অতিথিরা। তাদের ভাষ্য, সেই হামলার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজন সৃষ্টি করা। কিন্তু এক দশক পর দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, সেই ট্র্যাজেডি বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশে যাতে আর কখনও সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে সব সময় সজাগ থাকতে হবে।

হোলি আর্টিজান হামলার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার রাজধানীর গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের হামলায় নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তাদের স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

দুপুর সাড়ে ১২টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে ফারাজ আইয়াজ হোসেনের বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন এবং বাংলাদেশ পুলিশ ও ঢাকায় বসবাসরত ইতালীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, নিহতদের স্মৃতির পাশাপাশি তাদের পরিবারের অসীম সাহস, ধৈর্য ও ঐক্যের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো উচিত। তিনি বলেন, তাদের স্মৃতি যেন ঘৃণা নয়, মানবতা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতার পথে আমাদের পরিচালিত করে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হামলার দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে। সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান কঠোর এবং এ ধরনের শক্তির বাংলাদেশে কোনো স্থান নেই।

ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, নিহতরা বিভিন্ন দেশের হলেও তাদের স্বপ্ন ছিল এক। তারা ছিলেন তরুণ, মেধাবী এবং সম্ভাবনাময় মানুষ। তাদের স্মরণ করা মানে একটি উন্মুক্ত, সহনশীল ও মানবিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকারকে পুনরুজ্জীবিত করা। হামলার সময় জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যদের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধা জানান।

রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লার বার্তা তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়, হামলাকারীরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইলেও বাস্তবে আরও শক্তিশালী হয়েছে সংহতি, সংলাপ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ। সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মা ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান, ইতালি ও জাপানের নিহত নাগরিকদের পরিবারের সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রদূত আলবার্ট সিয়া, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ রামাদান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ২২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান এবং দুই বাংলাদেশি নাগরিক। হামলা প্রতিরোধে অভিযানে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন