পুড়ছে রাশিয়া, তবু অনড় পুতিন

সিএনএনের বিশ্লেষণ

পুড়ছে রাশিয়া, তবু অনড় পুতিন

ফন্ট সাইজ:

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর বিভিন্ন পেট্রোলপাম্পে জ্বালানির জন্য গাড়ি ও ট্রাকের দীর্ঘ সারি এখন সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠেছে। তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক চালক পুরো দিন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছেন না। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের রাজধানীতে এমন পরিস্থিতি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব থেকে দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা মস্কোতে এই সংকট নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার সাধারণ মানুষ ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছেন। যদিও ক্রেমলিন এখনও এই যুদ্ধকে “বিশেষ সামরিক অভিযান” বলে উল্লেখ করে।

রাশিয়ার অভ্যন্তরে গত এক মাসে ইউক্রেন নজিরবিহীন ড্রোন হামলা চালিয়েছে। গত সপ্তাহে এক রাতেই রাশিয়া দাবি করেছে, তারা দেশের ১২টি অঞ্চলে ৬৬০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিকে অন্যতম বৃহৎ ড্রোন হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। তেল শোধনাগার, জ্বালানি টার্মিনাল, নৌবাহিনীর জাহাজ এবং রাশিয়ার অভ্যন্তরে অবস্থিত অস্ত্র কারখানাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করা এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় বাড়িয়ে দেয়া।

জ্বালানি সংকট ছড়িয়ে পড়ছে
স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানির জন্য দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন চালকেরা। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে দখল করা ক্রিমিয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করে জ্বালানি বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রুশ কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করলেও এখন সংকট আড়াল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সপ্তাহান্তে জরুরি বৈঠকের সভাপতিত্ব করে স্বীকার করেন, দেশের পেট্রোলের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। তিনি বলেন, চালক ও ব্যবসায়ীদের সমস্যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। পুতিন আরও বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও অনেক পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া তিনি জানান, ডিজেল রপ্তানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে। যদিও কয়েকদিন আগেই রুশ উপ-প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন কোনো নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন নেই।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পুতিন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংকট কৃষিখাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার প্রভাব কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকে রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবস্টেশন ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করার কৌশল নিয়েছিল। এখন ইউক্রেন একই ধরনের কৌশল রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে এবং এর প্রভাব সাধারণ রুশ নাগরিকরাও অনুভব করতে শুরু করেছেন। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, ইউক্রেনের পক্ষে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের পরিস্থিতি ২০২৫ সালের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাশিয়ার ক্লান্তি এখন স্পষ্ট। তাই ইউক্রেনের প্রতি আমাদের সমর্থন আরও বাড়ানোর এটাই উপযুক্ত সময়। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও সামরিক রসদ পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রেও পড়ছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলেছে, ড্রোন অভিযান জোরদারের ফলে ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন প্রায় ৭৮ বর্গমাইল এলাকা পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছে এবং ২০২৫ সালজুড়ে রাশিয়ার অগ্রযাত্রার ধারাও অনেকটা থেমে গেছে। জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়ার একটি সমঝোতায় আসা উচিত। কয়েকদিন পর ওয়াশিংটনে ওভাল অফিসে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে “সাহসী” বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, তিনি যুদ্ধে ভালোভাবেই লড়াই করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর যেখানে ট্রাম্প ইউক্রেনকে দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, সেখানে তার এই বক্তব্যে অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। অন্যদিকে জেলেনস্কি বলেছেন, প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলে ইউক্রেন খুব দ্রুত এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারবে, যাতে রাশিয়া শান্তির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটকে রাশিয়ার আত্মসমর্পণের লক্ষণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দীর্ঘদিন ধরে ভ্লাদিমির পুতিন নিজেকে আপসহীন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ফলে ইউক্রেন ইস্যুতে পিছু হটা বা বড় ধরনের সমঝোতা করা তার জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। পশ্চিমা দেশগুলোর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে ইতোমধ্যে রাশিয়ার পক্ষে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি জানিয়েছে মস্কো, যদিও সেসব অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনও তাদের হাতে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ায় এমন কোনো শান্তিচুক্তি, যা স্পষ্ট বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না, তা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া পুতিনের ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী মহল এখনও পুরো দনবাস অঞ্চল দখলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাই কয়েকটি তেল শোধনাগারে হামলা বা জ্বালানি সংকট দেখা দিলেও রাশিয়া খুব শিগগির যুদ্ধ থেকে সরে আসবে-এমন ধারণা এখনই করার সুযোগ নেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন