২০০৩ সালের ২৯শে জুন। ইংল্যান্ডের স্টোরব্রিজে বেলিংহাম পরিবারে জন্ম নেয় এক শিশু। বাবা মার্ক ও মা ডেনিস তাদের প্রথম সন্তানের নাম রাখলেন জুড। কালের পরিক্রমায় পরের ঘটনাটা গত রোববারের, ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। পানামাকে ২-০ গোলে হারানোর পর বিখ্যাত ইংলিশ রক ব্যান্ড দ্য বিটলসের সেই জনপ্রিয় গান ‘হেই জুড’ গলায় তুললো পুরো স্টেডিয়াম। যাকে উদ্দেশ্য করে গানটা, ক্যামেরা ঘুরে গেল তার দিকে। বড় পর্দায় দেখা গেল, গ্যালারির দিকে তাকিয়ে তৃপ্ত নয়নে চোখের জল ফেলছেন তিনি। বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে সেরা হয়ে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডকে নকআউটে তোলার মূল কাণ্ডারি যে এই তরুণই!
অথচ বিশ্বকাপের আগমুহূর্তেও ইংল্যান্ডের শুরুর একাদশে জুডের জায়গা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। রিয়াল মাদ্রিদের গত দুই মৌসুম চোট আর পজিশন বদলের গ্যাঁড়াকলে পড়ে কিছুটা ম্লান কেটেছে তার। তবে জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে আসতেই চেনা রূপে ফিরলেন জুড। ৩ ম্যাচে ২ গোল আর ১ অ্যাসিস্ট- ইংল্যান্ডের মোট গোলের ৫০ শতাংশেই সরাসরি জড়িয়ে তার নাম। পানামার বিপক্ষে প্রথমার্ধের ডেডলক ভাঙা গোল আর হ্যারি কেইনকে দিয়ে করানো দ্বিতীয় গোলটি যেন টুখেল-সাম্রাজ্যে বেলিংহামের অপরিহার্যতার কথাই জানান দিচ্ছে। কীভাবে টুখেলের এই মাস্টারপ্ল্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হয়ে উঠলেন জুড? উত্তরটা লুকিয়ে তার ট্যাকটিক্যাল বৈচিত্র্য আর দলের জন্য নিজেকে সঁপে দেয়ার মানসিকতায়। পানামা ম্যাচে ডেকলান রাইস আর রিস জেমসের চোট টুখেলকে বাধ্য করে কৌশলে কিছুটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে। রাইসের অনুপস্থিতিতে প্রথমার্ধে জুডকে খেলানো হয় একদম ‘বক্স-টু-বক্স বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকায়। দলের প্রয়োজনে নিজের চিরচেনা আক্রমণাত্মক রূপ খোলস বন্দি করে প্রথমার্ধে জানপ্রাণ দিয়ে রক্ষণ সামলান ইংলিশ তারকা। পানামার বিপজ্জনক প্রতি-আক্রমণ রুখতে মাঝমাঠে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। পুরো ম্যাচে ৪টি ট্যাকল আর ১১টি ডুয়েল জিতে তিনি প্রমাণ করেন, রক্ষণেও তিনি কতটা অদম্য।
জুডের এই আত্মত্যাগ ছুঁয়ে গেছে টুখেলকেও। ম্যাচের পর শিষ্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কোচ বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই যে এটি কোনো প্রতিক্রিয়া কি না। তবে আমরা তার কাছ থেকে এটিই চাই। একজন টিম প্লেয়ার হিসেবে আমরা যা যা দাবি করি, জুড তার সবটুকুই পুরোপুরি মেনে নিয়েছে।’
টুখেলের সহকারী অ্যান্থনি ব্যারি বিরতির সময় দলের অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। সেই কঠিন ৩০ মিনিটে জুডের অক্লান্ত এনার্জিই বাঁচিয়ে দেয় ইংল্যান্ডকে। দ্বিতীয়ার্ধে টুখেল চাইলেন গতি। জুডকে ডিফেন্সিভ রোল থেকে ঠেলে দেয়া হলো ‘নাম্বার ১০’ পজিশনে। আর সেখানেই ঘটলো ম্যাজিক। মার্কাস র্যা শফোর্ড নিচে নেমে এসে পানামার ডিফেন্সকে টেনে উপরে তুলতেই জুড সেই শূন্যস্থানে ডায়াগনাল রান (অফ দ্য বল মুভমেন্ট) নিলেন। প্রথম গোলটির নেপথ্যে ছিল তার বুদ্ধিদীপ্ত দৌড় ও ড্রিবলিং। আর দ্বিতীয় গোলটিতে র্যা শফোর্ডের পাস ধরে নিখুঁত মাপা ক্রসে অ্যাসিস্ট করলেন কেইনকে।
জুডের এই রূপ দেখে মুগ্ধ সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল স্কাই স্পোর্টসের পডকাস্টে বলেন, ‘পানামার বিপক্ষে বেলিংহামকে দেখে আমার তরুণ বয়সের রয় কিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। যে মাঝমাঠে লড়াই করবে, ডিফেন্সিভ কাজ করবে, আবার প্রতিনিয়ত বক্সে দৌঁড়ে গিয়ে ফাইনাল থার্ডে নিজের কোয়ালিটি দেখাবে। পানামার বিপক্ষে ও একজন কমপ্লিট মিডফিল্ডার ছিল। ও নিজেকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছে।’ সাবেক স্ট্রাইকার ইয়ান রাইটের মতেও, জুড আসলে এই ডিপার রোলেই বেশি স্বচ্ছন্দ। সেখানে সে সবসময় বলের কাছাকাছি থেকে ম্যাচটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
কাঁধে এই বিশাল দায়িত্বের বোঝা নিতে অবশ্য বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ নেই ২৩ বছরের জুডের। তিনি নিজেই যেন তার ভেতরের তাড়নাটা স্পষ্ট করলেন মিক্সড জোনে এসে, বললেন, ‘দ্বিতীয়ার্ধে আমরা সবাই একটু বেশি শার্প আর ক্লিনিক্যাল ছিলাম। আমার ওপর দলকে অন্য একটা স্তরে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব কাজ করে। আমরা প্রথমার্ধের তেমন শুরুর পর বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের আরও গিয়ার পরিবর্তনের সুযোগ আছে। দ্বিতীয়ার্ধে আমরা সেটাই দেখিয়েছি।’
তবে এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের আড়ালে ক্লাব ফুটবলের একটা সূক্ষ্ম বিতর্কও উস্কে দিয়েছেন জুড। রিয়াল মাদ্রিদে তার ফর্মের তারতম্য নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সরাসরি আঙ্গুল তুলেছেন পজিশনের দিকে। জুডের ভাষায়, ‘আমি মনে করি না এটা আত্মবিশ্বাসের ব্যাপার। রিয়াল মাদ্রিদে আমি একটু ভিন্ন ভূমিকায় খেলি, একটু গভীরে। ইংল্যান্ডের হয়ে আমি খেলি নাম্বার ১০ হিসেবে, কিংবা আরেকটু অ্যাডভান্সড নাম্বার ৮ হিসেবে। আমি কোথায় খেলছি বা কোন পজিশনে আছি তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি সবসময় আমার দলের জন্য ভালো খেলতে চাই।’
রিয়ালের নতুন কোচ জোসে মরিনহো নিশ্চয়ই জুডের এই মন্তব্যে কান পাতবেন। তবে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর আগামী মৌসুমের সমীকরণটা জটিল। সেখানে আর্দা গুলের, ব্রাহিম দিয়াজ কিংবা নতুন আসা বার্নার্ডো সিলভাদের সঙ্গে পজিশন ধরে রাখার লড়াই করতে হবে জুডকে। তবে আপাতত তাকে ঘিরেই ফুটবলকে ‘ঘরে ফেরানো’র স্বপ্ন বুনছে থ্রি লায়নরা।
