ফুটবল জার্সি এখন আর শুধু খেলার পোশাক নয়, বরং ফ্যাশনের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবল জার্সির জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি এখন মাঠের দর্শক কিংবা সমর্থকদের গণ্ডি পেরিয়ে দৈনন্দিন পোশাকের অংশে পরিণত হয়েছে।
জনপ্রিয় মার্কিন গায়িকা অলিভিয়া রদ্রিগো সম্প্রতি স্পটিফাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে এফসি বার্সেলোনার একটি বিশেষ সংস্করণের রেট্রো জার্সি বাজারে এনেছেন। লাল-নীল ডোরাকাটা জার্সিতে তার নিজস্ব মনোগ্রাম যুক্ত ছিল। বাজারে আসার পরপরই জার্সিগুলো বিক্রি শেষ হয়ে যায়।
শুধু তাই নয়, গ্যাপ ফুটবল সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত দুটি সীমিত সংস্করণের গ্রীষ্মকালীন কালেকশন প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে নাইকি লাতিন আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে দুটি “স্টেটমেন্ট জার্সি” কালেকশন বাজারে এনেছে।
অবশ্য অনেকে এখনো স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলতেও জার্সি পরে নামছেন। তবে বর্তমানে বাজারে আসা অধিকাংশ নতুন জার্সি কোনো নির্দিষ্ট ক্লাব বা জাতীয় দলের হুবহু অনুকরণ নয়। বরং এগুলোর নকশা কখনো পরিচিত ফুটবল জার্সির প্রতি ইঙ্গিত করে, আবার কখনো সম্পূর্ণ নতুন ফ্যাশনধারা তৈরি করছে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি শহরের নামে রেট্রো ডিজাইনের বিশেষ ফুটবল জার্সি উন্মোচন করেন। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে এর মূল্য রাখা হয় মাত্র ৫০ ডলার। কিন্তু পরে বিলাসবহুল পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে একই জার্সি এক হাজার ডলারেরও বেশি দামে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হয়।
দলীয় প্রতীক ব্যবহারের পরিবর্তে জার্সিগুলোতে একটি ফুটবলের প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এবারের বিশ্বকাপে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং একটি ফ্যাশন স্টাইলেও পরিণত হয়েছে।
খেলার মাঠ থেকে ফ্যাশনের র্যাম্পে
ফ্যাশন ম্যাগাজিন প্রকাশক মার্কুস এবনার বলেন, ইন্টার মায়ামির গোলাপি জার্সিটি নিউইয়র্কের কোনো স্টাইলিশ তরুণী নাচের আসরেও পরে যেতে পারেন। তিনি ইন্টার মায়ামির সমর্থক বলেই নয়, বরং জার্সিটি সুন্দর এবং ফ্যাশনেবল বলেই।
ফ্যাশন আলোকচিত্রী ফিল ওহ বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল জনপ্রিয় হতে সময় লেগেছে। একসময় ফুটবল জার্সি পরাকে ঘিরে নানা ধরনের স্টেরিওটাইপ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জার্সিও মূলধারার ফ্যাশনে জায়গা করে নিয়েছে।
স্ট্রিটওয়্যার ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ
২০০৫ সালেই স্ট্রিটওয়্যার ব্র্যান্ড সুপ্রিম আমব্রোর সঙ্গে যৌথভাবে ফুটবল জার্সি তৈরি করেছিল। পরে র্যাপার স্নুপ ডগ বিভিন্ন ক্লাবের জার্সি নিয়মিত পরতে শুরু করেন। ২০১৬ সালে ড্রেকের গোলাপি জুভেন্টাস অ্যাওয়ে জার্সি পরাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ভিনটেজ ফুটবল জার্সি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান কাল্ট কিটস-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জশ ওয়ারউইক বলেন, কয়েক বছর ধরে তিনি লক্ষ্য করছেন, এখন শুধু ফুটবলপ্রেমীরাই নয়, ফ্যাশন সচেতন সাধারণ মানুষও পুরোনো ফুটবল জার্সি কিনছেন।
২০২২ সালে নিউইয়র্কে তাদের একটি পপ-আপ স্টোরে কয়েকজন তরুণী ১৯৯৬ সালের ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের উজ্জ্বল হলুদ রঙের অ্যাওয়ে জার্সি কিনেছিলেন। তারা দলটির ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতেন না; জার্সির নান্দনিক নকশাই তাদের আকৃষ্ট করেছিল।
ওয়ারউইক বলেন, এটি দেখিয়েছে যে ফুটবল জার্সির সংস্কৃতি এখন শুধু ক্লাবপ্রেমীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেকেই এখন জার্সির নকশা ও সৌন্দর্যের জন্য এটি সংগ্রহ করছেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র কাল্ট কিটসের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হয়েছে, এমনকি যুক্তরাজ্যকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের নতুন ব্যবসা
মিয়া, নাহমিয়াস, আইমে লিওন ডোরে, কেবিসহ বহু ফ্যাশন ব্র্যান্ড নিজেদের লোগো ব্যবহার করে ফুটবল জার্সি বাজারে এনেছে। এইচঅ্যান্ডএম লোট্টোর সঙ্গে যৌথ সংগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে এএসওএস বিভিন্ন জাতীয় দলের আদলে তৈরি জার্সিও বিক্রি করছে। একই সঙ্গে ১৯৯০-এর দশকের ক্লাসিক ফুটবল জার্সির পুনর্মুদ্রিত সংস্করণও এখন ব্যাপক জনপ্রিয়। নাইকি ও ফ্যানাটিকস পুরোনো জার্সির নতুন সংস্করণ বাজারে এনেছে। এবেটস ফিল্ড আবার বিলুপ্ত নর্থ আমেরিকান সকার লিগের ক্লাসিক জার্সিও নতুনভাবে তৈরি করছে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে ব্যবসায়িক সুযোগ
ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ ও চীনে ফ্যাশন বাজারের প্রবৃদ্ধি কমে গেলেও উত্তর আমেরিকায় বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপকে ঘিরে ব্র্যান্ডগুলো তাই নতুন নতুন ফুটবল জার্সি বাজারে আনছে। ফিল ওহের মতে, এর অন্যতম কারণ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা।
তার ভাষায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবরক্ষকেরা বলছেন, ফুটবলের বাজার দ্রুত বাড়ছে। তাই এই খাতে বিনিয়োগ করো।
শিশুদের খেলার পোশাক থেকে বিশ্ব ফ্যাশনের প্রতীক
ফুটবল ইতিহাসবিদ ব্রায়ান ডি. ব্যাংক জানান, ১৯৫০-এর দশকে ফুটবল জার্সি মূলত শিশুদের খেলার পোশাক হিসেবেই বিক্রি হতো। তখন জার্সিতে স্পনসর বা ক্লাবের লোগো থাকত না।
১৯৮০-এর দশক থেকে রঙিন টেলিভিশনের প্রসার এবং অ্যাথলেজার ফ্যাশনের উত্থানের ফলে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও ফুটবল জার্সির ব্যবহার বাড়তে থাকে।
১৯৯০-এর দশকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে নিজেদের মেগাস্টোর চালু করে জার্সি ও ক্লাবপণ্য বিক্রি শুরু করে। পরে অন্যান্য ক্লাবও একই পথ অনুসরণ করে।
বর্তমানে একজন খেলোয়াড়ের নামসহ একটি নতুন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড জার্সির দাম প্রায় ২০০ ডলার। প্রতি মৌসুমে নতুন নকশার জার্সি প্রকাশ করায় সমর্থকেরাও নিয়মিত নতুন জার্সি কিনতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
শুধু পোশাক নয়, আবেগের প্রতীক
যদিও ফুটবল জার্সি এখন বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, তবুও প্রকৃত সমর্থকদের কাছে এর আবেগের মূল্য এখনও অটুট। একসময় আফগানিস্তানের এক শিশুর প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে বানানো লিওনেল মেসির জার্সি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। পরে মেসি তাকে স্বাক্ষর করা দুটি জার্সি উপহার দেন এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন।
আইভরি কোস্টের ফুটবলার ইয়ান দিয়োমান্দে সম্প্রতি জানিয়েছেন, ছোটবেলায় পাওয়া একটি নকল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড জার্সির পেছনে তিনি নিজ হাতে কালো মার্কার দিয়ে “রোনালদো” ও ৭ নম্বর লিখেছিলেন।
ফ্যাশন ডিজাইনার মার্টিন রোজের ভাষায়, আমার সংগ্রহে সবসময় ফুটবল সংস্কৃতির প্রভাব থাকে। কারণ ফুটবল এমন একটি খেলা, যা মানুষকে একত্র করে, আশা জাগায় এবং সারা বিশ্বের মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করে।
