উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন’কে ঘিরে অসংখ্য রহস্য। তবে তার মাকে ঘিরে গোপনীয়তা সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়গুলোর একটি। ক্ষমতায় আসার ১৫ বছরে তিনি প্রকাশ্যে একবারও তার মায়ের নাম উচ্চারণ করেননি। কিমের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বৈধতা অনেকটাই নির্ভর করে তার তথাকথিত ‘মাউন্ট পায়েকতু রক্তধারা’র ওপর। এ বংশপরিচয়কে কোরীয় জাতির পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকার বলে প্রচার করা হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
আর এমন একটি দেশে, যেখানে এই বংশগত বিশুদ্ধতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গৌরবের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেখানে কিমের মায়ের পরিচয় শুধু একটি গোপন তথ্যই নয়, বরং সেটি শাসনব্যবস্থার জন্য সম্ভাব্য হুমকিও। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরীয় জাতির ইতিহাস শুরু হয়েছিল মাউন্ট পায়েকতু থেকে। চীন ও উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত এই পর্বতকে ডানগুনের জন্মস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডানগুনকে কোরিয়ার প্রথম রাজ্যের পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। হাজার হাজার বছর পর উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় এই পাহাড়কে নিজের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রচার করা হয়। পরে তার ছেলে কিম জং ইল-এরও জন্ম এই পবিত্র পাহাড়ের ঢালেই হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে দাবি করা হয়। যদিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে তার জন্ম সম্ভবত রাশিয়ায় হয়েছিল। এরপর থেকে কয়েক দশক ধরে মাউন্ট পায়েকতু’কে কিম পরিবারের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া সাবেক কূটনীতিক রিউ হিউন-উ তার বই ‘কিম জং উনের সিক্রেট ভল্ট’-এ লিখেছেন, বিশের কোঠায় থাকা কিম জং উন কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন ছাড়াই কেবল পায়েকতু রক্তধারার কারণেই উত্তরসূরি হয়েছেন। কিন্তু কিমের মাতৃসূত্রের বংশপরিচয়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলে। মাউন্ট পায়েকতু থেকে কয়েক শ মাইল দূরে রয়েছে জাপানের ঐতিহাসিক শহর ওসাকা। ধারণা করা হয়, সেখানেই ১৯৫২ সালে কিমের মা কো ইয়ং হুই জন্মগ্রহণ করেন। জীবনীকারদের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, কো ইয়ং হুইয়ের বাবা-মা মূলত বর্তমান দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ উপকূলের কাছে অবস্থিত জেজু দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন।
জাপানে বসবাসকারী তাদের পরিবার ছিল জাইনিচি কোরিয়ান। অর্থাৎ ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরীয় উপদ্বীপে জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনামলে জাপানে চলে যাওয়া কোরীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসী। কো ইয়ং হুইয়ের বয়স যখন প্রায় ১০ বছর, তখন তার পরিবার উত্তর কোরিয়ায় চলে যায়। তারা ছিলেন প্রায় ৯৩ হাজার কোরীয়ের মধ্যে, যারা ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে একটি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় উত্তর কোরিয়ায় পাড়ি জমান। তখন তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, সেখানে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগসহ এক আদর্শ জীবন অপেক্ষা করছে। প্রথমদিকে জাপান থেকে আসা এসব অভিবাসীকে অনেকেই ঈর্ষার চোখে দেখতেন। কারণ তারা সঙ্গে করে নগদ অর্থ, পোশাক ও গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক সামগ্রী নিয়ে এসেছিলেন।
তবে একই সঙ্গে তাদের জ্জায়েপো নামে অবজ্ঞাসূচক একটি পরিচয়ে ডাকা হতো। রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিতে তারা এমন একটি গোষ্ঠী, যারা বিদেশি ও বিপজ্জনক মতাদর্শে প্রভাবিত বলে বিবেচিত হতো। উত্তর কোরিয়ার সমাজ অত্যন্ত কঠোরভাবে স্তরবিন্যস্ত। অনেক বিশ্লেষক এই সামাজিক কাঠামোর তুলনা বর্ণব্যবস্থার সঙ্গে করেন। এই সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে বলা হয় সংবুন। এই ব্যবস্থায় জ্জায়েপো’রা ছিল তথাকথিত দোদুল্যমান শ্রেণির অন্তর্ভুক্তদ- যা মূল বা অনুগত শ্রেণি এবং শত্রু শ্রেণির মাঝামাঝি অবস্থানে। তাদের ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় নজরদারি চালানো হতো। এ ছাড়া তাদের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরি পাওয়ার সুযোগও প্রায় থাকত না। এটি কিম পরিবারের বহুদিন ধরে প্রচারিত পায়েকতু রক্তধারার কাহিনির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
নর্দার্ন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন-এর গবেষক কিম হিউং-সু বলেন, শাসকগোষ্ঠীর প্রচারণায় পায়েকতু রক্তধারাকে পবিত্র বলে তুলে ধরা হয়। তাই দেশের সর্বোচ্চ নেতা একজন জ্জায়েপোর সন্তানÑএমন ধারণাই অকল্পনীয়।
