সমঝোতা স্মারক কি বিদেশে সফরসঙ্গী হওয়ার বড় হাতিয়ার?

সমঝোতা স্মারক কি বিদেশে সফরসঙ্গী হওয়ার বড় হাতিয়ার?

ফন্ট সাইজ:

সংবাদমাধ্যমে এবং পত্রপত্রিকায় প্রায়ই দেখতে পাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরে এতগুলো সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ সই হয়েছে। এবং এনিয়ে বিরাট একটা অর্জন হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। আসলে অধিকাংশ সমঝোতা স্মারকের কোনো মূল্য বা কার্যকারিতা নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় স্মারকলিপি সই করার প্রস্তাব করে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমঝোতা স্মারক সই করার প্রস্তাব পাঠায় এবং এর ফলে ওই মন্ত্রণালয়ের সচিব বা অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হতে পারেন। তবে কোনো কোনো সময় তারা সফরসঙ্গী হতে ব্যর্থ হন। তখন তাদের ঐ সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ ওই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের যে রাষ্ট্রদূত আছেন তা তিনি স্বাক্ষর করেন ।

আমেরিকার আদলে রাষ্ট্র্রদূত নিয়োগের পর সংসদীয় শুনানির প্রবর্তন: কিছুটা অর্জন

আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে কিছু নিয়ম চালু করি। একটি ছিল যিনি কোনো একটি দেশে রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ পেয়ে যাচ্ছেন তিনি ওই দেশে গিয়ে কী কী অর্জন করতে চাচ্ছেন তা সংসদীয় কমিটিতে জানাবেন। সংসদীয় কমিটির সদস্যরা তাকে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন করবেন, ইত্যাদি। আমি চেয়েছিলাম আমেরিকায় যে প্রথা চালু আছে তা বাংলাদেশে চালু করতে। তবে পারি নি।

আমেরিকার নিয়ম ও সংসদীয় শুনানি

আমেরিকায় যারা সিন্ধান্ত নেয়ার চাকরিতে নিয়োজিত হন যেমন সেক্রেটারি বা মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত, বিচারপতি বা অনুরূপ দায়িত্বে নিয়োজিত হন তাদের অবশ্যই সিনেট সংসদীয় কমিটির শুনানির সম্মুখীন হতে হয়। এসব কমিটি তাকে বিভিন্ন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন এবং তারা তিনি সে পদের উপযুক্ত কিনা বিচার বিশ্লেষণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে এসব শুনানিতে বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা বা অন্যবিধ যারা এসব বিষয়ে অবগত আছেন তারা শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। ওই ব্যক্তিবিশেষ তার জীবনে কোনো অন্যায় করেছেন কিনা, আইনের বরখেলাপ করেছেন কিনা বা তার দৃষ্টিভঙ্গি কী তা তারা বিচার বিশ্লেষণ করেন। এসব শুনানির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের সুপারিশকৃত ব্যক্তিবিশেষ ওইপদের উপযুক্ত কিনা তা তারা যাচাই করেন। যদি শুনানিতে মনে হয় তিনি উপযুক্ত নন, তাহলে সিনেট কমিটি প্রেসিডেন্টকে নতুন অন্য কোনো ব্যক্তিকে সে পদে মনোনয়ন দিতে অনুরোধ করেন। প্রেসিডেন্ট তখন নতুন কাউকে মনোনীত করেন। এই পদ্ধতি অনেক স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়মে কোনো বিচার বিশ্লেষণের সুযোগ নেই

তবে বাংলাদেশের নিয়ম হচ্ছে ওই মন্ত্রণালয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এই এই ব্যক্তি বিশেষকে ওইপদে (এক্ষেত্রে রাষ্ট্রদূত) নিয়োগ দিতে পারেন বলে সুপারিশ করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তখন সুপারিশকৃত ব্যক্তি বিশেষদের মধ্যে থেকে একজনকে বা তার পছন্দের অন্য একজনকে নিয়োগ দান করেন।

তবে বাংলাদেশের সংসদীয় কমিটির শুনানি প্রথমত তার নিয়োগ বন্ধ করতে পারে না এবং দ্বিতীয়ত ঐ শুনানিতে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি বা অন্য কেউ যোগদান বা অংশগ্রহণ করতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত যে নিয়ম চালু করেছিলাম তা হচ্ছে যখন কোনো রাষ্ট্রদূত তার দায়িত্ব পালন করে স্বদেশে ফিরবেন তখন তিনি মন্ত্রণালয়ের সকল কর্মকর্তা এবং কূটনীতিকদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন সময়ে তিনি ওই দেশে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং তা তিনি কীভাবে মোকাবেলা করেন তা জানাবেন যাতে অন্যান্যরা তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে । তবে দুঃখের বিষয় যে অনেক নামীদামী রাষ্ট্রদূতরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে উৎসাহ বোধ করেন নি।

সমঝোতা স্মারকে বা এমওইউ বাক্সবন্দি ?

আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে যারা নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেতেন তারা ওইদেশে যাওয়ার প্রাক্কালে যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তখন প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম “আপনি কি জানেন ওই দেশের সাথে কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে এবং সেগুলো কী কী’’। প্রায় ক্ষেত্রেই তা তিনি বা তারা জানেন না। সুতরাং ঐ স্মারকলিপির প্রেক্ষিতে তাকে কী কী উদ্যোগ নেয়া উচিত তা তিনি জানেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের এমওইউ বা সমঝোতা চুক্তি- বাংলাদেশ থেকে ভিন্ন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগে অনেক আলোচনা এবং বিচার বিশ্লেষণ করা হয়। সাম্প্রতিক ইউএসএ এবং ইরানের মধ্যে সম্পাদিত এমওইউ বা চুক্তি

এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই স্বাক্ষরিত স্মারকের প্রতিটি বিষয় ৬০ দিনের মধ্যে অবশ্যই সমাধান করতে হবে। তার ব্যত্যয় হলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে-কি কঠিন সমঝোতা চুক্তি! আমাদের ক্ষেত্রে তার কোনো বালাই নাই ।

স্মারকলিপির কপি প্রায়ই খুঁজে পাওয়া যায় না ?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ওই দেশের সাথে যে সব স্মারকলিপি স্বাক্ষরিত হয়েছে তা পেশ করতে বললে তারা প্রায় ক্ষেত্রেই বলবেন “স্যার কী কী স্মারকলিপি স্বাক্ষরিত হয়েছে তা তো ওই মন্ত্রণালয়ে আছে, আমাদের কাছে নেই’’। সেজন্য আমি আদেশ করেছিলাম যে যতগুলো স্বারকলিপি স্বাক্ষরিত হবে তার প্রত্যেকটির একটি কপি আমাদের অর্থাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাখা উচিত ’’।

অনেক সময় ওই মন্ত্রণালয়ে যারা ঐ স্মারকলিপি তৈরি করেছিলেন তাদের কাছেও থাকে না। কারণ সফরের আগেভাগে তড়িঘড়ি করে তা তারা প্রস্তুত করেন বিদেশে সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য। সই করার পর এ স্মারক লিপিটি কার কাছে রয়েছে সেটা অনেক সময় জানা যায় না। তবে সব স্মারকলিপির যে হদিস পাওয়া যায় না, এমন নয়। কোনো কোনো স্মারকলিপি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ।

সাংবাদিকরাও নির্বিকার?

এক সময় আমি এক সাংবাদিককে দুটো অনুরোধ করেছিলাম। প্রথমত (১) আপনি আমাদের মন্ত্রণালয়কে জিজ্ঞেস করুন যে যেদেশের সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে সেগুলোর একটি লিস্ট প্রকাশ করতে এবং দ্বিতীয়ত (২) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কতজন কর্মচারী বা কর্মকতার নিজের এবং পরিবারের কতজনের বিদেশী নাগরিকত্ব আছে। তবে তিনি তা সংগ্রহ করতে পারেননি ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যারা কাজ করেন তাদের কোনো ছেলেমেয়ে বাংলাদেশ সরকারে চাকরি করেন না।

বাংলাদেশ সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যারা বিদেশে কাজ করেন তাদের প্রত্যেকের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করা বাবদ প্রতিবছর ২০ হাজার ডলার সরকার প্রদান করে। তবে স্বদেশে কর্মরত থাকলে মাত্র এক হাজার টাকা প্রদান করা হয়। বিশ হাজার ডলার আর এক হাজার টাকা- বিরাট ব্যবাধান। তাই কেউই দেশে থাকতে চায় না। এই ২০ হাজার ডলার সকল কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-অফিসার, ড্রাইভার, পিয়ন,-সবাই এসুযোগ পান। তবে দুঃখজনক হচ্ছে যে এই অনুদান নিয়ে যারা শিক্ষিত হয়ে উঠেন তাদের কেউই স্বদেশে ফিরে যান না এবং দেশের কাজে নিয়োজিত হন না। তবে ব্যতিক্রম দুজন। কয়েক শো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজন এর ব্যতিক্রম । শুধু মাত্র দুজন কর্মচারির মেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছেন এবং তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। যেহেতু শিশুকালে তারা তাদের পিতার চাকরির কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ম কানুন আয়ত্ত্ব করেন এবং একাধিক ভাষার সংস্পর্শে আসেন, সুতরাং তারা সহজেই বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হন।

সরকারের কাছে দাবি থাকবে- যে যে দেশের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে তার তালিকা প্রকাশ করুন এবং সমঝোতা স্মারক যেগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে তার প্রেক্ষিতে কী কী অর্জন হয়েছে তা জাতি জানতে চায় ।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন