কখনো একটি মাত্র সিদ্ধান্ত হাজারো বক্তৃতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সোনারগাঁ থানা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে, জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে ডিবি পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাটি তেমনই একটি ঘটনা। এটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার সন্তানের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ‘প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা আইনের ঊর্ধ্বে’ এই ধারণার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। কার্যত এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকার চাঁদাবাজ ও অপকর্মকারীদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একটি অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে কিছু ব্যক্তি চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন খাতের আধিপত্য, বাজার নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে জনগণ অভিযোগ করেছে, অপরাধের অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক পরিচয় তাদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা জন্ম নিয়েছে যে আইন যেন সবার জন্য সমান নয়।
খাইরুল ইসলাম সজীবকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে যে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ এবং একই সঙ্গে যুবদলের পক্ষ থেকে তাকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে অভিযোগ গুরুতর হলে রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার বেসরকারি ব্যবহার। জনগণ ভোট দেয় জনপ্রতিনিধিদের উন্নয়ন, সেবা ও নেতৃত্বের জন্য। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নির্বাচিত প্রতিনিধির আত্মীয়স্বজন কিংবা অনুসারীদের একটি অংশ সেই রাজনৈতিক অবস্থানকে ব্যক্তিগত ক্ষমতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজনৈতিক দল, সরকার এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা।
একজন সংসদ সদস্য জনগণের প্রতিনিধি। তার পরিবারের সদস্য কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে-আইন কি সমানভাবে কাজ করবে? সজীবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া এবং অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়া অন্তত এই বার্তা দিচ্ছে যে অভিযোগ উঠলে তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে, পরিচয় যাই হোক না কেন।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। একটি দেশের উন্নয়ন কেবল সেতু, মহাসড়ক কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয় না; পরিমাপ করা হয় তার প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি এবং আইনের শাসনের কার্যকারিতার মাধ্যমে। যেখানে চাঁদাবাজি থাকবে, সেখানে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। যেখানে দখলবাজি থাকবে, সেখানে উদ্যোক্তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। আর যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধকে আড়াল করবে, সেখানে জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী কারখানা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে এই অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে যদি চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ আধিপত্য কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; জাতীয় অর্থনীতির ওপরও পড়ে। ফলে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুবদলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের রক্ষায় নেমে পড়ার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে অভিযোগের মুখে একজন নেতাকে বহিষ্কার করা ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। কারণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের আস্থা রক্ষা করা।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই তিনি অপরাধী এমন নয়। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ। তাই সজীবের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত হওয়া এবং জবাবদিহিতার আওতায় আসা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে, তথ্য-প্রমাণ যাচাই হবে এবং আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে—এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
বর্তমান সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণকে বিশ্বাস করানো যে অপরাধ দমনে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করবে না। কারণ অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলেও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন। জনগণ এখন কথার চেয়ে কাজ দেখতে চায়। তারা দেখতে চায়—অপরাধী যদি জনপ্রতিনিধির সন্তানও হন, তবুও আইন কি একইভাবে প্রয়োগ হয়?
বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলোর শক্তি এখানেই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবারের সদস্যরাও তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। কারণ সেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান বড়। বাংলাদেশেরও সেই পথে এগোতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখা দরকার চাঁদাবাজি শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি অর্থনীতির বিরুদ্ধে অপরাধ, বিনিয়োগের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার বিরুদ্ধে অপরাধ। একজন ব্যবসায়ীকে যদি প্রতিনিয়ত চাঁদা দিতে হয়, তাহলে সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ভোক্তারা। তাই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান মানে শুধু অপরাধ দমন নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও অংশ।
তবে সরকার যদি সত্যিই এই ঘটনাকে একটি দৃষ্টান্তে পরিণত করতে চায়, তাহলে শুধু একজন এমপি-পুত্র বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না। একই মানদণ্ডে সব দলের, সব পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি, তাদের সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা চাঁদাবাজ-দখলবাজদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ জনগণ এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযান দেখতে চায় না; তারা একটি ধারাবাহিক, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমান প্রক্রিয়া দেখতে চায়। আইনের প্রয়োগ যদি ব্যক্তি, দল বা পরিচয়ভেদে ভিন্ন হয়, তাহলে জনমনে আবারও প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু যদি রাষ্ট্র প্রমাণ করতে পারে যে অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে একজন অপরাধী, তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা।
এই ঘটনাটি সরকারের জন্যও একটি সুযোগ। এই সুযোগ হলো প্রমাণ করার যে রাষ্ট্র সত্যিই অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। যদি তদন্ত স্বচ্ছ হয়, বিচার প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ হয় এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব কাজ না করে, তাহলে জনগণের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে বাংলাদেশে আইনের শাসন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
জনগণ আজ আর কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি দেখতে চায় না। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে একজন রিকশাচালক, একজন ব্যবসায়ী, একজন জনপ্রতিনিধি কিংবা একজন এমপির সন্তান—সবার জন্য একই আইন কার্যকর হবে। রাষ্ট্রের শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানকারী ব্যক্তিও আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হন।
খাইরুল ইসলাম সজীবকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাটি তাই কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতার একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলো কতটা সফল হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কারণ জনগণ স্পষ্ট বার্তা চায় বাংলাদেশে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজনীতি আর চলবে না। আর যদি সত্যিই সেই বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সজীবকে ঘিরে এই ঘটনাটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করবে অপরাধীর কোনো দল নেই, কোনো পরিচয় নেই, কোনো প্রভাব নেই। তার একমাত্র পরিচয়, সে আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য একজন নাগরিক। যে দিন এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে, সে দিনই বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী, জনবান্ধব, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি বিশ্ব দরবারে আরো বেশি উজ্জ্বল করবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের মুখ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
