ভেনেজুয়েলার উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বুধবার বিকেলে আঘাত হানা স্মরণকালের ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। রিখটার স্কেলে ৭.৫ মাত্রার এই শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং এর ঠিক ৪০ সেকেন্ড আগের ৭.২ মাত্রার তীব্র ভূ-কম্পনে ধসে পড়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন ও আবাসিক বাড়িঘর। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এই দুর্যোগে ভয়াবহ প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ১০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ছুটির দিনে আকস্মিক বিপর্যয়
১৮২১ সালের স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভের ঐতিহাসিক সামরিক বিজয় উদযাপনের জন্য বুধবার দেশটিতে সরকারি ছুটি থাকায় অধিকাংশ মানুষই নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করছিলেন। ঠিক এমন সময় আকস্মিক এই কম্পনে পুরো দেশ কেঁপে ওঠে। আতঙ্কিত মানুষজন ঘরবাড়ি ও পোষা প্রাণী নিয়ে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে বহুতল ভবনের সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। কারাকাসের ৪১ বছর বয়সী বাসিন্দা অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, "ভূমিকম্প শুরু হতেই চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই তখন জীবন বাঁচাতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার জন্য দৌড়াচ্ছিল।"
ধ্বংসস্তূপে পরিণত রাজধানী কারাকাস
ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন অংশে বড় বড় ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বহু ভবনের দেয়াল ভেঙে পড়েছে এবং ধসে যাওয়া কাঠামোর কারণে পুরো এলাকা ধুলার আস্তরণে ঢেকে গেছে। রাত নামার সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিস, পৌর পুলিশ এবং জরুরি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা আলো জ্বালিয়ে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছেন।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয় বিষয়ক মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়ো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, "কারাকাসে বেশ কিছু বড় ভবন ধসে পড়েছে এবং অনেক ঘরবাড়ি পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে গেছে।" তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি।
তেল শোধনাগার এলাকায় আঘাত
ইউএসজিএস জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ইউমারে থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং মন্তালবান থেকে ২৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। এই অঞ্চলটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এখানেই ভেনেজুয়েলার কিছু বৃহত্তম তেল শোধনাগার অবস্থিত। শোধনাগারগুলোর কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।
১৯৬৭ সালের চেয়েও ভয়াবহ
ভূমিকম্পের পর কারাকাসের রাস্তায় ফায়ার সার্ভিসের অসংখ্য গাড়ি এবং আহতদের সরিয়ে নিতে উদ্ধারকর্মীদের ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। মারিয়া রোমেরো নামে ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা বলেন, "পুলিশ আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে সাহায্য করেছে। এই ভূমিকম্পটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ, ১৯৬৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের চেয়েও এটি অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ছিল।" উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালে কারাকাসে ৬.৩ মাত্রার এক ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ভেনেজুয়েলা ভৌগোলিকভাবে ক্যারিবিয়ান প্লেট এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল।
সুনামি সতর্কতা জারি ও প্রত্যাহার
ভূমিকম্পের পর পরই মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র উপকূলের ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে বিপজ্জনক ঢেউয়ের আশঙ্কায় পুয়ের্তো রিকো, ইউএস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড এবং ভেনেজুয়েলা উপকূলের আরুবা, কুরাকাও ও বোনায়ার দ্বীপপুঞ্জের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করে। তবে সমুদ্রের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় প্রায় এক ঘণ্টা পর এই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
বর্তমানে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আটকা পড়াদের উদ্ধারে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হচ্ছে।

MD.Hafiz uddin
২ ঘন্টা আগেAlmighty Allah! May save Bangladesh.