২৩শে জুন ছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এদিন ভারতের অনলাইন দ্য প্রিন্ট-এ ‘মাই অ্যাবসেন্স ইজ নট সাইলেন্স। দো আই অ্যাম অ্যাওয়ে, আই অ্যাম উইথ পিপল অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা। লেখায় তিনি বলেছেন, তার অনুপস্থিতি নীরবতা নয়। বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আছেন তিনি। তার ভাষায়- আমি কখনো বাংলাদেশের মানুষকে পরিত্যাগ করিনি। এ দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে আমি কখনো পিছু হটিনি। আমি বাংলাদেশের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ফিরে আসবো। আমি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জনগণের ভোটাধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ফিরে আসবো। আমি জনগণের শক্তির মধ্য দিয়েই ফিরে আসবো। ওই লেখায় তিনি প্রশাসনে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের হুঁশিয়ার করেছেন।
নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেছেন। নিচে তার লেখাটির হুবহু অনুবাদ তুলে ধরা হলো- ২৩শে জুন বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি দিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে মানুষের দাবি-দাওয়া প্রতিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ সেই যাত্রার ৭৭ বছর পূর্ণ হলো। আওয়ামী লীগ শাসকদের খেয়াল-খুশি, বিদেশি শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা ক্ষমতার লালসা থেকে জন্ম নেয়া কোনো দল নয়। এটি পূর্ব বাংলার মাটি, মানুষ, ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এক আবেগ। ৭৭ বছরের পথচলায় এই সংগঠন কখনো মানুষের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, অন্যায়ের কাছেও মাথা নত করেনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা- আমাদের জাতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে আওয়ামী লীগের আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব এবং সংগ্রাম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি জনগণকে সংগঠিত করেছিলেন এবং তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। তিনিই দেশের নামকরণ করেছিলেন- ‘বাংলাদেশ’। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত আওয়ামী লীগেরই ইতিহাস।
শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার: স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র?্যমুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং মর্যাদাপূর্ণ ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি; এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, সংবিধান এবং বাঙালি জাতিসত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সামরিক শাসন, ষড়যন্ত্র, অভ্যুত্থান, ইতিহাস বিকৃতি, মৌলবাদী শক্তির পুনর্বাসন এবং গণতন্ত্রবিরোধী রাজনীতির মাধ্যমে স্বাধীনতার মূল চেতনাকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনো থেমে থাকেনি। কারাবরণ, গুম, হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা এবং নিষেধাজ্ঞাও আওয়ামী লীগকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ বারবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, দারিদ্রে?্যর হার কমেছে, শতভাগ বিদ্যুতায়নের পথে অগ্রসর হয়েছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ তার জনগণের জন্য একটি নিরাপদ আবাসভূমিতে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রয়ণ প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি এসব কেবল স্লোগান বা প্রতিশ্রুতি নয়; এগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের বাস্তব ও দৃশ্যমান উদাহরণ। আমরা মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি যে সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পেলে বাঙালি জাতি নিজেদের শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু আজ বাংলাদেশ আবারো গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। ঘৃণা, বিভাজন, প্রতিহিংসা, জনতার সহিংসতা, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, মিথ্যা মামলা এবং রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের যে পথ অনির্বাচিত ও অসাংবিধানিক ইউনূস-নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শুরু করেছিল, তা এখন মঞ্চস্থ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনেও অব্যাহত রয়েছে। ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রহসন, যেখানে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী সংগঠনটিকে ভোটের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল, সেই নির্বাচন জনগণের রায় প্রতিফলিত করেনি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে পরাজিত হয়নি; বরং তারা নিশ্চিতভাবে পরাজিত হবে- এমন আশঙ্কা থেকেই রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিগুলো দলটিকে সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
এটি শুধু আওয়ামী লীগের ওপর আঘাত নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকারের ওপরও আঘাত।
জনগণের হৃদয়ে আওয়ামী লীগ: আজও আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। বাড়িতে অভিযান, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, পরিবারের সদস্যদের হয়রানি, সম্পত্তি জব্দ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। এমনকি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন, পতাকা উত্তোলন কিংবা রাজনৈতিক মত প্রকাশকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কথা স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন- শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানানো কোনো অপরাধ নয়। ‘জয় বাংলা’ বলা কোনো অপরাধ নয়। আওয়ামী লীগকে ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। জনগণের অধিকার, ভোটাধিকার এবং গণতন্ত্রের কথা বলা কোনো অপরাধ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়; তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। রাজনৈতিক নির্দেশে নিরপরাধ মানুষকে গ্রেপ্তার করা, মিথ্যা মামলা দেয়া, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন করা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নাগরিকদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনসম্মত দায়িত্ব নয়; বরং তা ক্ষমতার অপব্যবহার।
অন্যায় আদেশ পালন করে ইতিহাসের বিচারের হাত থেকে কেউ রেহাই পেতে পারে না। যারা মানুষের অধিকার হরণ করছে, যারা মায়েদের সন্তানহারা করছে, যারা শিশুদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে এবং নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, তাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডেরই শেষ পর্যন্ত আইন, ইতিহাস এবং জনগণের আদালতে জবাবদিহি করতে হবে। কোনো সরকার স্থায়ী নয়, কোনো ক্ষমতা স্থায়ী নয়; স্থায়ী হলো জনগণ। তাই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অবসান ঘটাতেই হবে। আমি জানি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছেন। কেউ কারাগারে আছেন, কেউ মিথ্যা মামলার কারণে গৃহহীন হয়েছেন, কেউ আহত হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার অনেকেই তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন। ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, চাকরি হারাতে হয়েছে, শিশুদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও তারা মাথা নত করেননি। আমি তাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানি। আমি তাদের বেদনা অনুভব করি।
আমার অনুপস্থিতি নীরবতা নয়। আমি দূরে থাকলেও বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আছি; আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মীর আত্মত্যাগ, সাহস এবং বেদনার সঙ্গে আমি আছি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আইনি পথের মাধ্যমে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার মধ্যদিয়ে অব্যাহত রয়েছে।
আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হতে পারে, কিন্তু জনগণের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা যাবে না। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাস, বাংলাদেশের সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের নাম। মামলা, নিষেধাজ্ঞা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অপপ্রচারের মাধ্যমে এই দলকে শেষ করে দেয়া সম্ভব নয়।
আওয়ামী লীগের সংগ্রাম: বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন, ভোটাধিকার এবং উন্নয়নের পথ। অন্যদিকে রয়েছে প্রতিহিংসা, জনতার সহিংসতা, মৌলবাদ, ইতিহাস বিকৃতি, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্ধকারের পথ। বাংলাদেশের মানুষ কখনো অন্ধকারের পথ বেছে নেয়নি, এখনো নেবে না। এই জাতি ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ দেখেছে। বাঙালি জাতিকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ৭৭ বছরের যাত্রাপথে আওয়ামী লীগ বহুবার আক্রমণের শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে এবং বহু ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আওয়ামী লীগ জনগণের শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। এবারো দাঁড়াবে। জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধার করা হবে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে এগিয়ে যাবে।
এ সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব আরও বেশি। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেশের প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড এবং ইউনিয়নে মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে। আমাদের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আমাদের আপসহীন থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়; এটি মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার রাজনীতি।
আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি বাংলাদেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি, আমার পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য রাজনীতি করি। পথ কঠিন, কিন্তু আওয়ামী লীগের ইতিহাস হলো কঠিন পথ অতিক্রম করার ইতিহাস। আমরা পরাজিত হওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করিনি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার জন্য আমরা সংগ্রাম করিনি। আমরা লড়েছি, লড়ছি এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবো।
১৯৮১ সালে আমি দেশে ফিরে এসেছিলাম গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। আমি আমার পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়েছি- আমার বাবা-মা এবং ভাইদের। কিন্তু আমি কখনো বাংলাদেশের মানুষকে পরিত্যাগ করিনি। এ দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে আমি কখনো পিছু হটিনি। আমি বাংলাদেশের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ফিরে আসবো। আমি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জনগণের ভোটাধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ফিরে আসবো। আমি জনগণের শক্তির মধ্যদিয়েই ফিরে আসবো। বাংলাদেশের মানুষ তাদের গণতন্ত্র, অধিকার এবং মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে। আজ দেশের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের ভয় জয় করতে হবে। বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মিথ্যা প্রচারণা, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ এবং রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমি বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং নির্যাতিত দুই লাখ মা-বোন, ১৫ই আগস্টের শহীদ, গণতন্ত্রের সংগ্রামে শাহাদতবরণকারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং সাম্প্রতিক দমনপীড়নের ঢেউয়ে নিহত, আহত, পঙ্গুত্ববরণকারী, কারাবন্দি কিংবা বাস্তুচ্যুত আমার সকল সহযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। আওয়ামী লীগের সংগ্রাম থেমে থাকবে না। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মুহূর্তে আমাদের শপথ একটাই- ভয় নয়, সাহস; বিভাজন নয়, ঐক্য; প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার; অন্ধকার নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকিত পথ, যে পথে আমাদের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে ছিল, জনগণের সঙ্গে আছে এবং জনগণের সঙ্গে থাকবে। জনগণের শক্তির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবারো জেগে উঠবে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করবে, বাংলাদেশকে আবারো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ফিরিয়ে আনবে এবং জাতির পিতার স্বপ্নের সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলবে।
