শান্ত মানিকগঞ্জ ক্রমান্বয়ে অশান্ত হয়ে ওঠায় আইনশৃঙ্খলা চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক হানাহানি না থাকলেও একের পর এক হত্যাকাণ্ড ভাবিয়ে তুলছে জেলাবাসীকে। পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে আত্মহত্যার ঘটনাও। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে রাজধানী ঢাকার কাছের এই শান্ত জেলাটিকে ঘিরে বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবজমিন-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে গত ৩০শে মে রাত ১০টার দিকে বড় ভাইয়ের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আমেনা বেগম (২৮) ও দুই বছর বয়সের ভাতিজা আসওয়াদকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেছে ইউসুফ মোল্লা।
দীর্ঘদিন ধরে ছোট ভাই ইউসুফ মোল্লা ও বড় ভাই আব্দুস সালামের পরিবারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। আপন বড় ভাইয়ের স্ত্রী ও ভাতিজাকে হত্যার ঘটনার চারদিন পর তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকার মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে ইউসুফকে আটক করা হয়। হত্যার মাস্টারমাইন্ড ইউসুফ ও তার সহযোগী হিসেবে ভাগ্নে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১৬ই এপ্রিল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপাড়িল গ্রামে শিশু শিক্ষার্থী আতিকা আক্তার (৮)কে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হত্যাকারীর বাবা ও চাচাসহ দুইজনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে গ্রামবাসী। শিশু আতিকাসহ তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলা জুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ওইদিন বিকালে এলাকার প্রবাসী দুলু মিয়ার শিশুকন্যা আতিকা পাশের বাড়ির একটি বিয়ের হলুদের অনুষ্ঠানে যায়। একই এলাকার তরুণ নাঈম কৌশলে আতিকাকে এলাকার একটি ভুট্টা খেতে নিয়ে হত্যা করে।
শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয় লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ঘাতক নাঈমের খোঁজে তার বাড়িতে যায়। বাড়িতে তাকে না পেয়ে বিক্ষুব্ধকারীরা নাঈমের পিতা পান্নু মিয়া ও তার ছোট ভাই ফজলু মিয়াকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি মামলা করে। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় একটি একটি হত্যা মামলার আসামি সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল আলীমকে ছাড়িয়ে নিতে ১লা জুন থানা ঘেরাও এবং বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় জনগণ। এর আগে ১৭ তারিখে উপজেলার ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের সুদীপ হোসেনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে সংঘবদ্ধ জনতা। ওই ঘটনায় আসামি করা হয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল আলিমকে। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রামে গত ২৪শে মে প্রবাসীর স্ত্রী সাথী আক্তার (২৮)কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
প্রবাসী শুকুর আলীর ভাগিনা রিপন মিয়া পারিবারিক কলহের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। গত ৩রা এপ্রিল শিবালয় উপজেলার আলোকদিয়া চরে যমুনা নদীতে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের গুলিতে মিরাজ হোসেন নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। এদিকে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় উত্তর কাশাদা এলাকায় গ্রাম্য সালিশে প্রকাশ্যে শারীরিক নির্যাতন চালানোর অপমান ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে নাজমা আক্তার নামে এক তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। নাজমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ তুলে ১৭ই এপ্রিল রাতে তার বাবার বাড়িতে গ্রাম্য সালিশ বসানো হয়। গত ২৪শে মার্চ ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের রাথুরা গ্রামের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক রফিক মিয়াকে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করেছে তারই বন্ধুরা। তার বন্ধু একই গ্রামের রিপন মিয়া বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। মস্তকবিহীন লাশ কালিগঙ্গা নদীর পাড়ে পড়ে থাকে।
পরে আসামিকে গ্রেপ্তারের পর রফিকের মাথা উদ্ধার করা হয়। সম্প্রতি হরিরামপুর উপজেলায় বৃদ্ধ মা’কে গলা কেটে হত্যা করেছে নিজের মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ে। যা নিয়ে এলাকায় তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। এদিকে শিশু শিক্ষার্থী আতিকা আক্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রেশ কাটতে না কাটতেই অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করার ঘটনায় তোলপাড় চলছে জেলা জুড়ে। গত ১৫ই জুন নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া আক্তারের (১৪) দ্বিখণ্ডিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারের সময় নিহত ছাত্রীর দেহের উপরের অংশ ছিল একটি গাছের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় এবং নিচের কোমরের অংশ পড়েছিল মাটিতে। লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চান্দরনগর এলাকায়। গত রোববার সন্ধ্যার দিকে সেখানকার একটি কবরস্থান সংলগ্ন নির্জন ঝোপের ভেতর থেকে স্কুলছাত্রীর খণ্ডিত মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত স্কুলছাত্রী সিংগাইর উপজেলার শায়েস্তা ইউনিয়নের চরলক্ষ্মীপুর গ্রামের সৌদি প্রবাসী মিজানুর রহমানের মেয়ে।
এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফ ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলামসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে নিহতের মা কামরুন নাহার বাদী হয়ে মামলা করেছে। সিংগাইর থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ই জুন বিদ্যালয়ে টিফিন চলাকালে একটি শ্রেণিকক্ষে দশম শ্রেণির ছাত্র আরিফের সঙ্গে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মারিয়ার আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের স্কুলে ডেকে মুচলেকা রেখে কর্তৃপক্ষ উভয় শিক্ষার্থীকে টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেয়। ঘটনার পর থেকেই স্কুলছাত্রী মারিয়া নিখোঁজ হয়। এ ছাড়া প্রায় প্রতিনিয়ত জেলা জুড়েই আত্মহত্যা এবং হত্যার মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে।
