বাবার অসম্পূর্ণ গল্পের পূর্ণতা দিলেন। ‘ভাইকিং রো’ ভাসিয়ে জানান দিলেন আমিও আছি। বলছি আর্লিং ব্রুট হালান্দের কথা। যার বাবা আলফ ইঙ্গে হালান্দও ফুটবলার ছিলেন। নরওয়ে জাতীয় দলের হয়ে মিডফিল্ড পজিশনে খেলতেন। পিতা-পুত্র দু’জনেরই ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে মাঠে নামা হয়েছে। তবে এতদিন নরওয়ের হয়ে অপূর্ণতার গল্প বয়ে বেড়িয়েছেন আলফ। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে এসে ইস্ট রাদারফোর্ডে নিউজার্সি স্টেডিয়ামে ইতালির বিপক্ষে হেরে মাঠ ছেড়েছিলেন। তিন ম্যাচে ১ জয়, ১ হার ও ১ ড্র’য়ে গ্রুপপর্বেই বাদ পড়ে নরওয়ে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে একই মাঠে ইতিহাস গড়েছে তারা। সেনেগালকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নকআউটের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে। তাদের এ সাফল্যের নায়ক আলফের পুত্র হালান্দ।
নরওয়ের বিশ্বকাপ দলে হালান্দ ছাড়াও খেলছেন এমন দু’জনের বাবাও ১৯৯৪ বিশ্বকাপ মাতিয়েছেন। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে খেলা আলেকজান্ডার সোরলথ এবং ক্রিস্টিয়ান থর্সভেট। সোরলথের বাবা গোরান সোরলথ। থর্সভেটের বাবা এরিক থর্সভেট। এই বাবাদের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি প্রায় ৫৭ লাখ নওরোজিয়ানদের ‘ভাইকিং রো’ উদ্যাপনের সারথি হলেন হালান্দ। উদ্যাপনের মাত্রা এমন ছিল যে, দেশটির সংসদ সদস্যরা বিখ্যাত রোয়িং সেলিব্রেশনে মাতেন। যুবরাজ হাকোনের সন্তানরা গ্যালারিতে বসে দলকে উৎসাহ দেন। খেলোয়াড়রাও ভাইকিং ঐতিহ্যের অংশ হতে ভোলেননি। রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে নরওয়ে কোচ স্টোলে সোলবাকেন গ্যালারির দিকে ছুটে যান। সিঁড়ি বেয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেন। চুমু খান। মাঠে তখন অপেক্ষায় পুরো দল। কোচ না আসলে শুরু হবে না সেলিব্রেশন। হাঁপাতে হাঁপাতে মাঠে প্রবেশ করেন সোলবাকেন। পেছনে গিয়ে বসেন হালান্দ। আর তখনই শুরু নরওয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিশ্বকাপের মাঠে সবুজ ঘাসে হাজারো সমর্থককে সাক্ষী রেখে ‘ভাইকিং রো’ সেলিব্রেশন।
শুরুতে সারিবদ্ধ হয়ে বসেন নরওয়ের খেলোয়াড়রা। ঠিক যেন একটি ভাইকিং লংবোট! সামনে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। তার হাতে ড্রাম। সেটি বাজানো শুরু করলেন। পেছনে বসা হালান্দ, সোরলথ, থর্সভেট- পুরো দল। একসঙ্গে দাঁড় বাইলেন সবাই। গ্যালারি ফেটে পড়লো উল্লাসে। ‘ভাইকিং রো’ উদ্যাপন নরওয়ের সমর্থকদের চিরন্তন ঐতিহ্য। এবারের বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে, এস্কেলেটরে, এমনকি নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারেও লাল জার্সি পরা নরওয়েজিয়ানরা এই উদ্যাপন করেছেন। কিন্তু সেনেগাল ম্যাচের পর মাঠে খেলোয়াড়দের সেই দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। রয়টার্সের ক্যামেরায় ধরা পড়ে পুরো দেশ এক হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। দেখা গেল ট্রন্ডহেইমে টেলিভিশনের সামনে বসে দেশটির সমর্থকরাও গ্যালারির ভঙ্গিতে দাঁড় বাইছেন। ম্যাচের প্রথমার্ধে নরওয়েকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে সেনেগাল।
দাপট দেখিয়েও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পেতে ভাইকিংদের অপেক্ষা করতে হয় ৪৩ মিনিট পর্যন্ত। ডেডলক
ভাঙেন নরওয়ের মার্কাস পেডেরসন। বিরতির পর লিড দ্বিগুণ করেন হালান্দ। ৪৮ মিনিটে করা তার গোলে ২-০ তে এগিয়ে যায় দল। ৫৩ মিনিটে এক গোল শোধ করে সেনেগাল। ইসমাইলা সারের গোলে ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখছিল আফ্রিকার দেশটি। ৫৮তম মিনিটে আবারো গোল করেন হালান্দ। এই বিশ্বকাপে এটি তার চতুর্থ গোল। এ নিয়ে টানা ১২ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল পেলেন ম্যানচেস্টার সিটি ফরোয়ার্ড। নরওয়ের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে গোল করলেন হালান্দ। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেশ রোমাঞ্চ ছড়ান সার। তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ফেরা হয়নি সেনেগালের। ৩-২ গোলের জয় নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে হালান্দের নরওয়ে। দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে ‘আই’ গ্রুপে দ্বিতীয় তারা। গ্রুপ সেরা হওয়ার লড়াইয়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলবে নরওয়ে। বাবাদের প্রজন্ম থেমেছিল গ্রুপপর্বে। ছেলেরা সেই গণ্ডি টপকে গেছে। সামনে ভাইকিং নৌকার গন্তব্য বহুদূর।
