নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেলেন ‘মেসি দ্য ম্যাজিশিয়ান’। এক ম্যাচে ভাঙলেন বিশ্বকাপের দুই রেকর্ড। গতকাল অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। ডালাস স্টেডিয়ামে এই ম্যাচে জোড়া গোল করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। চলতি বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপে টানা দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শেষ ৩২ রাউন্ড নিশ্চিত করলো আর্জেন্টাইনরা। এদিন দিয়েগো ম্যারাডোনার এক স্মৃতি তাজা করেন মেসি। ১৯৮০তে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে হ্যাটট্রিক করেছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা। গতকাল পেনাল্টি মিস না করলে হ্যাটট্রিক পেতেন মেসিও।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এখন মেসির। তার গোলসংখ্যা দাঁড়ালো ১৮-তে। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডটি ভেঙে দিলেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। ক্লোসার আরও একটি রেকর্ড ভাঙলেন মেসি। বিশ্বকাপে এটি মেসির সর্বোচ্চ ১৭তম জয়। ১৬টি জয় রয়েছে ক্লোসার।
ডালাসে ওয়ান টাচের ফুটবলে ম্যাচ শুরু করে আর্জেন্টিনা। চতুর্থ মিনিটে দারুণ সুযোগও তৈরি করে আলবিসেলেস্তেরা। অস্ট্রিয়ার ডি বক্সে ফাউলের শিকার হন লাওতারো মার্টিনেজ। প্রথমে আমলে না নিলেও ভিএআর দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কিন্তু পেনাল্টি মিস করেন মেসি। দুর্বল শট মারেন কাছের পোস্টের বাইরে। যেন আকাশ ভেঙে পড়ে আর্জেন্টিনা ভক্তদের মাথায়। টিভির ধারাভাষ্যকার বলে ওঠেন, ‘মেসিও মানুষ’। তবে তিনি তো জাদুকর! খুব বেশি সময় নিলেন না। ওপেন প্লে থেকেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম খোদাই করে দিলেন।
টানা তিন বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করতে দেখা গেলো মেসিকে। ২০১৮তে আইসল্যান্ড ও ২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে পেনাল্টি মিস করেন মেসি। বিশ্বকাপে ৭ পেনাল্টি কিক থেকে মেসির আছে চার গোল। ফুটবলের মহামঞ্চে তিনটি পেনাল্টি মিসের রেকর্ড নেই আর কারও। দুটি পেনাল্টি মিস করেছেন কেবল ঘানার আসামোয়াহ জিয়ান। মেসির পেনাল্টি মিসের পর কিছুটা ছন্দ হারায় আর্জেন্টিনা আর মোমেন্টাম পায় অস্ট্রিয়া। ২০২২ বিশ্বকাপের পর আইসল্যান্ড ছাড়া কোনো ইউরোপিয়ান দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না আর্জেন্টিনার। আর অস্ট্রিয়ানদের ফ্রন্ট-ফুটে দেখে আর্জেন্টাইন ভক্ত-সমর্থকরাও হয়তো একটু চাপে। কিন্তু ঝলক দেখানোটাই যে মেসির কাজ! প্রথমার্ধের ৩৮তম মিনিটে এক আক্রমণ থেকে দুর্দান্ত শটে গোল করেন মেসি। চোখ জুড়ানো এই গোলে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন মেসি। বাঁ প্রান্ত থেকে ফাকুন্দো মেদিনার ক্রসে ডামি করেন থিয়াগো আলমাদা। এরপর মেসির বাঁ পায়ের শট অস্ট্রিয়ার জালে। ৫৫তম মিনিটে মার্সেল সাবিতসারের ফ্রিকিক ফিরিয়ে দিয়ে দলকে বিপদমুক্ত করেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। আর্জেন্টিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে অস্ট্রিয়ানরা। ৫৮তম মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরার জায়গায় নিকোলাস ওটামেন্ডিকে নামান কোচ লিওনেল স্কালোনি। ৭ মিনিট পর আর্জেন্টাইন কোচ করেন জোড়া পরিবর্তন। একযোগে মাঠে নামেন হুলিয়ান আলভারেজ ও নিকো গঞ্জালেজ। ৬৭তম মিনিটে আর্জেন্টাইন বক্সে দারুণ ক্রস করেন সাবিতসার। তবে ছোট ডি বক্সে ঠিক মতো মাথা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন মাইকেল গ্রেগরিটশ। ৭০তম মিনিটে একসঙ্গে তিন খেলোয়াড় পরিবর্তন করেন অস্ট্রিয়ার জার্মান কোচ রাল্ফ রাংনিক। ৭৪তম মিনিটে মেসির কর্নার কিক থেকে দারুণ হেড নেন নিকো গঞ্জালেজ। তবে বল পোস্টের বাইরে যায়। ম্যাচের শেষ দিকে অস্ট্রিয়ার বক্সের ভেতরে ছোটখাটো একটা ঝড়ই বয়ে যায়। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে সেই ঝড়ে শেষ পর্যন্ত মেসির মুখেই ফোটে পরিতৃপ্তির হাসি। প্রথমে আলভারেজের শট অস্ট্রিয়া ডিফেন্ডারের গায়ে লাগে। ফিরতি বলটা পান মেসি। এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নেয়া শট ঠেকান আরেক ডিফেন্ডার। আবারও ফিরতি বলে মেসির শট এবং গোল।
বিশ্বকাপে টানা ৬ ম্যাচে গোল করলেন মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপে শিরোপার পথে শেষ চার ম্যাচে গোল করেন তিনি। বিশ্বকাপে টানা ৬ ম্যাচে গোলের কৃতিত্ব আছে কেবল ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন (১৯৫৮ বিশ্বকাপ) এবং ব্রাজিলের জেয়ারজিনহোর (১৯৭০ বিশ্বকাপ)। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন এলএম টেন।
মেসির রেকর্ড আছে আরও। বিশ্বকাপে এক আসরে একাই দলের প্রথম ৫ গোল করা খেলোয়াড় কেবল মেসি ও রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো। বিশ্বকাপে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০টি আলাদা ম্যাচে প্রথম গোলের কীর্তি মেসির। ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও, ইতালির ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরি ও স্পেনের ডেভিড ভিয়া ৬টি আলাদা ম্যাচে প্রথম গোল করেছেন।
বিশ্বকাপে এটি আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়ার প্রথম দ্বৈরথ। আগে দু’দল মুখোমুখি হয় দু’বার। ১৯৮০ সালে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা জেতে ৫-১ গোলে। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ওই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা। দশ বছর পরের ম্যাচটি ছিল ১-১ ড্র।
গ্রুপের শেষ ম্যাচে আগামী ২৮শে জুন আর্জেন্টিনা খেলবে এশিয়ার দল জর্ডানের বিপক্ষে। শেষ ৩২ রাউন্ডে ‘জে’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়নরা ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ দলের মুখোমুখি হবে। আর ‘জে’ গ্রুপের রানার্সআপরা খেলবে ‘এইচ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে। যেখানে স্পেন, উরুগুয়ের সঙ্গে রয়েছে সৌদি আরব ও কেপ ভার্দে।
অন্য উচ্চতায় মেসি
নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা
আনোয়ার হোসেন পিন্টু
২৩ জুন (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
