যাযাবর থেকে বিশ্বমঞ্চের ‘নায়ক’ বেইরানভান্দ

যাযাবর থেকে বিশ্বমঞ্চের ‘নায়ক’ বেইরানভান্দ

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপের একাদশতম দিনে লস অ্যানজেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্ব দেখলো এক মহাকাব্যিক লড়াই। শক্তিশালী বেলজিয়ামের একের পর এক আক্রমণ বুক চিতিয়ে রুখে দিয়ে গোলশূন্য ড্র আদায় করে নিয়েছে ইরান। আর এই ড্রয়ের পেছনে রূপকথার নায়ক ইরানি গোলকিপার আলিরেজা বেইরানভান্দ।

ম্যাচের ৬০তম মিনিটে বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনার নিখুঁত পাস থেকে মাত্র চার গজ দূর ছিলেন মাক্সিম ডি কুইপার। তিনি যখন শট নিলেন, তখন গোল হওয়াটা ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার। বেইরানভান্দ তখন মাটিতে পড়ে অসহায়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মাটিতে পিঠ ঠেকানো অবস্থা থেকেই অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে বাঁ হাত দিয়ে বলটা আটকে দেন তিনি। ডি কুইপারের নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেয়ার এই দৃশ্য দেখে মাঠে থাকা বেলজিয়ান স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। ফুটবল বিশ্লেষকরা এটিকে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা সেভের তকমা দিচ্ছেন। পুরো ম্যাচে বেলজিয়ানরা গোলমুখে শট নিয়েছেন ৭টি। সেই ৭টি শটই ফিরে এসেছে ইরানের বেইরাভান্দ দেয়ালে বাধা পেয়ে।

সেই অবিশ্বাস্য সেভটি আসলে বেইরানভান্দের পুরো জীবনেরই এক প্রতীকী ছবি। মাটিতে পড়ে গিয়েও দমে না যাওয়ার মন্ত্রটা তিনি শিখেছেন শৈশব থেকেই। ইরানের এক যাযাবর পরিবারে জন্ম নেয়া বেইরানভান্দ ছোটবেলায় ভেড়ার পাল চড়াতেন। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বাধা দিয়ে বাবা যখন তার গ্লাভস আর জার্সি কেটে ফেলেন, তখন মাত্র ১২ বছর বয়সে পকেটে কোনো টাকা ছাড়াই তেহরানের বাসে চেপে বসেন তিনি। তেহরানের রাস্তায় আজাদি টাওয়ারের নিচে ফুটপাতে ঘুমিয়েছেন, কাপড়ের কারখানা, গাড়ির গ্যারেজ এবং পিৎজার দোকানে পার্টটাইম কাজ করে ফুটবল খেলা চালিয়ে গেছেন।

সেই লড়াকু ছেলেই আজ দেশের হয়ে ৮৮টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন, যার ঝুলিতে আছে ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি ঠেকানোর কীর্তিও। বেইরানভান্দ নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন সত্যি করতে আমি অনেক কষ্ট করেছি, তবে সেসব দিন আমি কখনো ভুলবো না। কারণ ওসব কষ্টই আমাকে আজকের এই মানুষটা বানিয়েছে। মাটিতে পড়ে গিয়েও কীভাবে অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে জেগে উঠতে হয়, বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেই প্রমাণই আরেকবার দিলেন তিনি।’

টানা দুই ম্যাচে ড্র করে ইরান এখন নকআউট পর্বের দোড়গোড়ায়। অথচ রাজনৈতিক জটিলতা ও নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। ম্যাচ শেষে ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোই তার দলের এই লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্য সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি মাথায় নিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে এসেছি। আমাদের ফুটবলাররা দেশের জন্য নিজেদের সবটুকু উজাড় করে হৃদয় দিয়ে খেলছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দল এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারতো না। ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এদের চিরকাল মনে রাখবে।’

আরও পড়ুন:
‘মেসিই সেরা’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন