রাজধানীর অভিজাত গুলশান-২ এলাকার ১০৪ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে সাবেক জাতীয় ফুটবলার, ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদীর দখলে থাকা এই বহুল আলোচিত সম্পত্তিকে সরকারের সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে বাড়িটি সরকারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইবাদত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ে আদালত বলেন, গুলশানের সিইএন (ডি)-২৭ নম্বর বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল এবং আইনগতভাবে অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এর সেই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পত্তিটি হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তা বৈধ নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে বাড়িটির মালিকানা পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ সম্পত্তির আইনগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেনি। ফলে বর্তমানে এটি সরকারের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে।
মামলার নথি ও আদালতে দাখিল করা অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসা বাড়িটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে একাধিক ব্যক্তি মালিকানা দাবি করেন। বিভিন্ন দলিল, নামজারি ও হস্তান্তর নথির মাধ্যমে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলেও এসব প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক এ বিষয়ে একটি রিট আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত একটি বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে ভোগদখলে থাকলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট বাড়ি-সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করেন এবং পরে বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশে দুদক অনুসন্ধান চালিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করে। অনুসন্ধানে সম্পত্তিটির মালিকানা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা, সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, নামজারি এবং দখল-সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। প্রতিবেদনে মালিকানা পরিবর্তনের বিভিন্ন ধাপে অসংগতি ও জালিয়াতির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। দুদকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত সম্পত্তিটির ‘চেইন অব টাইটেল’ বা মালিকানা হস্তান্তরের পূর্ণ ইতিহাস, দখল-সংক্রান্ত নথি এবং অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পক্ষগুলোকে হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দেন। পরে চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে আদালত বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরবর্তীতে আবদুস সালাম মুর্শেদীর নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের তথ্য নথিতে থাকলেও এর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে আইনগত অবস্থান কখনো পরিবর্তিত হয়নি। যথাযথ আদালতের মাধ্যমে অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তিই থাকবে। ফলে পরবর্তী সময়ে সম্পত্তি হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়া বেআইনি। হাইকোর্ট তিন মাসের মধ্যে সম্পত্তিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির মাধ্যমে সরকারের কাছে বুঝিয়ে দিতে সালাম মুর্শেদীকে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি সম্পত্তির দখল গ্রহণের ১৫ দিনের মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবকে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত অভিযোগে ইতোমধ্যে দুদকের মামলা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্তে জালিয়াতি বা অনিয়মের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি কিংবা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সালাম মুর্শেদীর পক্ষে আদালতে দাবি করা হয়, তিনি ১৯৯৭ সালে রাজউকের অনুমতি নিয়ে দুই ভাইয়ের কাছ থেকে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন এবং তখন থেকেই ভোগদখলে আছেন। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে। হাইকোর্টের এ রায়ের মাধ্যমে গুলশানের বহুল আলোচিত সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। একই সঙ্গে পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এবং এ সংক্রান্ত অনিয়মে কারা জড়িত ছিলেন, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
