অনেকেই বলেন নকল নাই। নকল না থাকলে পাসের হার অর্ধেকে নেমে আসে কীভাবে? কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে আগে পাসের হার ছিল ৯৭ পারসেন্ট। ২০২৫ সালে ৪৬ পারসেন্টেজ নেমে আসে কী করে? বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি আরও বলেন, এটা কী ইনডিরেক্ট নকল না? হ্যা নকল হয় না। এখন নকলের পদ্ধতি বন্ধ হয়েছে। এখন ডিজিটাল নকল হয়। আমরা ৯৮ এক্টের পরিবর্তন করব। খাতা দেখে লিখলে আগে শাস্তি হতো না। এখন হবে।
আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে বোর্ডগুলো সফর শুরু করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। সোমবার নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের আয়োজনে মত বিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী আলোচনার শুরুতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা যারা অনুপস্থিত ছিলেন তাদের তাৎক্ষণিক শোকজের আদেশ দেন। তিনি বলেন, কুমিল্লা বোর্ড থেকে আটটি কলেজে কোন পরীক্ষার্থী নাই। বোর্ডে লাস্ট ইয়ারে একজনও পাস করেন নাই। তারপরও আপনাদের সিরিয়াসনেস নাই।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে ট্রাস্ট করবেন আর সরকার এমপিও দেবে তা হবে না। ট্রাস্ট খুলে নিজের ইচ্ছামতো কমিটি দেবেন তা হবে না। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষককে জিম্মি করা হয়। এটা আর হবে না। ট্রান্সফার করা শুরু হবে। অন্যায় করলে পানিস্ট ট্রান্সফার হবে। শিক্ষায় দুর্নীতি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে মন্ত্রীর দায়িত্বে রাখবেন না। মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার জন্যই আমাকে দুর্নীতি রুখতে হবে।
তিনি বলেন, সাধারণ নয়টা বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন হতো।কেউ প্রশ্ন কঠিন করবে, কেউ সহজ করবে তা হবে না। এবার একই প্রশ্নে পরীক্ষা হবে। সামনে মাদ্রাসা ও কারিগরির কমন বিষয়গুলো একই প্রশ্নে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন না হওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, অন্তর্বর্তী শিক্ষক এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিলো। কিন্তু বাজেট দিলো না। অর্থ মন্ত্রণালয়কে বললাম, তাদের বেতন দেয়া লাগবে। তারা বললেন, এখন সম্ভব না। জুলাই থেকে এডজাস্ট করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগ দিলো কিন্তু বাজেট দিলো না। এইজন্যই এই ভোগান্তি। সারা বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজার হেডমাস্টার নাই। ২০১৭ সাল থেকে এই সমস্যা। কেউ সমাধান করল না। আদালতের মামলায় আটকে আছে। অনেকে অবসরে গেছেন তবুও হেড মাস্টার হতে পারেননি। অ্যাটর্নি জেনারেলকে চিঠি দিলাম। অনুরোধ করলাম যাই হোক জাস্ট রায়টা দেন। এরপর রায় আসলো সমাধান শিগগিরই আসছে।
শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, নকল হবে না। এটা ভালো। কিন্তু শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাবলেট দেবো। আমরা ট্যাবলেট চালানোর ট্রেনিং দেবো। আমরা স্মার্ট ক্লাস রুমও দিচ্ছি। সামনের শিক্ষা হবে আনন্দময়। আপনি এআই দিয়েও শিক্ষা দিতে পারবেন। এটা একদিনে হবে না। এটা ধীরে ধীরে করব। এবার আমরা নতুন কারিকুলাম পাচ্ছি না। ২৮ থেকে নতুন কারিকুলাম পাবো। নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল ৫ শতাংশ বাজেট দেয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকলে নাড়ি শুকিয়ে যায়। আমরা এরবেশি দিলে খরচও করতে পারবো না। ধীরে ধীরে তা বাড়বে। কোথাও টিনের ঘরে স্কুল থাকবে না। এমপির স্কুল চারতলা পাশের স্কুলে এক তালাও না সেটা হবে না।
এক শিক্ষক অবসর ভাতা নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি অবসরকালীন টাকা মেলার আগে মাস মাস টাকার আবেদন করেন। মন্ত্রী বলেন, পূর্বের সরকারের দুর্নীতির কারণে আপনারা আমরা সবাই বিপদে পরেছি। আমরা শিক্ষকদের নিয়ে টিচার্স পুল হবে। ইন হাউজ কোচিং সেন্টারে আপনার পড়ানোর সুযোগ হবে। আমরাও বিপদে পরেছি গত সরকার (আওয়ামী লীগ) নিয়ম না মেনে বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখে। সাত হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। আমরা সকল শিক্ষকদের শুরুতেই একটা অ্যামাউন্ট দিয়ে শুরু করা হবে। এরপর আবেদনের সিরিয়ালের ভিত্তিতে পরিশোধ করা হবে। দুই বছরের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান করা হবে।
মতবিনিময় সভায় নোয়াখালী ৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা হওয়া উচিত শিক্ষামুখী। গতানুগতিক সার্টিফিকেট অপেক্ষায় থাকা শিক্ষা দিয়ে কোন লাভ নাই। এরজন্য আমাদের শিক্ষা, পরীক্ষাকে মানসম্মত করতে হবে। সেটা হলেই বাংলাদেশের শিক্ষা আন্তর্জাতিক মানের হবে। আশা করি আগামীতে বাংলাদেশের শিক্ষা আন্তর্জাতিক মানের হবে।
এর আগে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২০তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস এবং ডিনস অ্যাওয়ার্ড ও ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এসময় তিনি বলেন, কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে ভালো করতে হলে আপনাদের লেখাপড়া ছাড়া যা দরকার তা আপনাদের কাছে নেই। আমি প্রথম ব্লু-ইকোনোমির কথা প্রথম শুনেছিলাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুখে। আমারা দেখেছি উনি ছাত্রদের কীভাবে উৎসাহিত করতেন, শুধু রাজনীতি নয় এর পাশাপাশি লেখাপড়াও করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা গত সপ্তাহে বগুড়া ইউনিভার্সিটি বিল পাস করেছি। সেখানে নতুন-নতুন বিষয় থাকবে। এই প্রথম ইউরোপ আমেরিকার মতো একটি ইউনিভার্সিটি হচ্ছে। নোয়াখালীতেও এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা রয়েছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আমরা গত সপ্তাহেই মন্ত্রিসভায় বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধনী অনুমোদন করেছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নার্সিং, মেডিক্যাল সায়েন্স, আইসিটি’র মত বিষয়গুলো থাকবে। নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়েরও সেই ধরনের ‘ইনক্লুসিভ’ বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তাদের সেই জায়গা, অবস্থান ও পরিবেশ রয়েছে। তাই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘ডিন’স অ্যাওয়ার্ড’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পুরস্কার। কারণ এর মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এই স্বীকৃতি পুরস্কারপ্রাপ্তদের অনুপ্রাণিত করবে। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলবে। পুরস্কারপ্রাপ্তরা আগামীর বাংলাদেশ গড়ার কাজে অনুপ্রাণিত হবে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি আলহাজ মো. শাহজাহান সংসদ সদস্য নোয়াখালী- ৪, ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম প্রো-ভিসি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রমুখ।
