টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে শিক্ষা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ জরুরি

টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে শিক্ষা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ জরুরি

ফন্ট সাইজ:

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার যে সংস্কার ও প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নীতির কথা বলছে, তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে শিক্ষা খাত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকে কেবল ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

শিক্ষা বাজেট এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, শিক্ষাবিদ ডা. জাহেদ উর রহমান, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম তাদের মতামত তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানকে একই ধারার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান উঠে আসে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান উৎস প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ। যে দেশ শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, সেই দেশই দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির সুবিধা পেয়েছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে জনমিতিক সুবিধা দ্রুতই বোঝায় পরিণত হতে পারে। তার মতে, শিক্ষা খাতের বিনিয়োগকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। শুধু বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ নয়, শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে প্রতিটি টাকার বিনিয়োগ ভবিষ্যতে বহুগুণ অর্থনৈতিক সুফল সৃষ্টি করে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও মুখস্থনির্ভরতা এবং পরীক্ষা কেন্দ্রিক সংস্কৃতি অনেক বেশি প্রভাবশালী। অথচ আধুনিক অর্থনীতিতে প্রয়োজন সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা। তাই বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে এখনও বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের একটি বড় অংশ শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই বাস্তবতায় দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বড় অংশ সৃষ্টি হবে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক উৎপাদনশিল্প, সেবা খাত এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে। এসব খাতের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি। তাই শিক্ষা বাজেটকে সরাসরি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা প্রয়োজন।

সিএসইআর এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, উন্নয়নশীল থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু দক্ষতা ঘাটতির কারণে এই সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, শিক্ষা খাতের বিনিয়োগকে শিল্পনীতি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তার ভাষায়, শুধু ডিগ্রিধারী তরুণ তৈরি করলেই হবে না; এমন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে যারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে। এজন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সিএসইআর-এর বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ শিক্ষার মান উন্নয়ন সরাসরি শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করে এবং উদ্ভাবন সক্ষমতা বাড়ায়। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ভিত্তি তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা তার জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নীতি সহায়তার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা অবকাঠামো, ল্যাব সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা বাজেটে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা গেলে দেশের শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতি বিকাশেও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো- প্রস্তাবিত শিক্ষা বাজেট দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বরাদ্দের পরিমাণের চেয়ে বেশি কার্যকর বাস্তবায়ন, গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর। তারা মনে করেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।

কর্মসংস্থান ও দক্ষতা ও উন্নয়নের নতুন ভিত্তি-সিএসইআর’র বিশ্লেষণ:
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। একদিকে হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ চাকরির জন্য অপেক্ষা করছে, অন্যদিকে শিল্প, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও উৎপাদন খাতে দক্ষ কর্মীর অভাবে বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ হয়েছে। এতে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সরকার জাতীয় অগ্রযাত্রার "নিউক্লিয়াস" হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেই অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এক অর্থবছরেই প্রায় ৫৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ। আগের বছর এই বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, জিডিপির মাত্র ১.৩৯ শতাংশ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ মনে করে, বাংলাদেশের আগামী দশকের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নির্ধারিত হবে প্রাকৃতিক সম্পদ বা অবকাঠামো দ্বারা নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ওপর। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা খাতে এই বরাদ্দ শুধু একটি ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে ওঠে শিক্ষা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের মাধ্যমে।

কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি এসেছে পাঠ্যক্রম সংস্কারে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন কর্মবাজার উপযোগী অন্তত একটি দক্ষতা (কৃষি, আইসিটি, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস, গ্রাফিক ডিজাইন, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ বা সৃজনশীল শিল্পে) প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। এর পাশাপাশি প্রযুক্তি শিক্ষায় "ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব" কর্মসূচি চালু এবং শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা ঋণ সুবিধার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার রোডম্যাপও ঘোষণা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার দীর্ঘদিন ধরে হতাশাজনক পর্যায়ে ছিল। মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক ধারায় পড়াশোনা করে। অথচ জার্মানিতে এই হার ৪৫ শতাংশের বেশি, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ। এশিয়ার মধ্যেও ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড এই খাতে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

শ্রমবাজারের বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। দেশে বর্তমানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিক। রপ্তানিমুখী শিল্প, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি খাতেই মধ্যম মানের দক্ষ কর্মীর ঘাটতি প্রকট। বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অদক্ষ হিসেবে প্রবেশ করায় তুলনামূলক কম মজুরি পান, যেখানে ফিলিপাইন বা ভারতের দক্ষ কর্মীরা একই বাজারে বহুগুণ বেশি আয় করছেন। এই বাস্তবতা জাতীয় রেমিট্যান্স আয়েও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটছে দ্রুততার সাথে। ফ্রিল্যান্সিং এখন আয় ও কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য একটি ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ডিজিটাল দক্ষতার সংযোগ ঘটানো সম্ভব না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক তরুণ এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্প এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে, তবে তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
বর্তমান বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতাকে পৃথকভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। "ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব" কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেয়া এবং সেই মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে আইসিটি-নির্ভর শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি শিক্ষার তালিকায় আইসিটিকে কৃষি বা স্বাস্থ্যের মতো সমান অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, যা আগে কখনো এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।

এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মতো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা বাড়তে পারে। বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্স মার্কেটে বাংলাদেশের অবস্থান ইতিমধ্যে শীর্ষ কয়েকটি দেশের মধ্যে। যদি মাধ্যমিক স্তর থেকেই ডিজিটাল দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করা যায়, তাহলে এই অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ আছে।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় যে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ নিতে হলে কতগুলো মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষক সংকট। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা চালু করতে হলে দেশের হাজার হাজার স্কুলে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি অত্যন্ত প্রকট। বরাদ্দ বৃদ্ধি এই সমস্যা সমাধান করতে পারে, কিন্তু শিক্ষক তৈরি করতে সময় লাগে, যা রাতারাতি সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোর দুর্বলতা। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ল্যাব এবং কর্মশালার অনুপস্থিতি একটি বড় বাধা। কাগজে-কলমে পাঠ্যক্রম যোগ হলেই প্রকৃত দক্ষতা তৈরি হয় না। হাতে-কলমে শেখার সুযোগ না থাকলে উদ্যোগটি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশে এখনো একটি বড় অংশের পরিবার মনে করেন যে কারিগরি শিক্ষা "নিচু মানের"। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না পেলে ছেলেমেয়েকে কারিগরিতে পাঠানো "ব্যর্থতা"। এই মানসিকতা না পাল্টালে বরাদ্দ থাকলেও ভর্তির হার বাড়বে না।

চতুর্থত, শিল্পের সাথে সংযোগ। কারিগরি শিক্ষার সাফল্য নির্ভর করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগকর্তা এবং পলিসি নির্মাতাদের মধ্যে কতটা সমন্বয় আছে তার ওপর। পাঠ্যক্রমে যা শেখানো হচ্ছে সেটা বাজারের চাহিদার সাথে মিলছে কিনা — এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া বিপুল বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
পঞ্চমত, বরাদ্দের বাস্তব ব্যবহার। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সহ একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সতর্ক করে দিয়েছে যে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হয় না, বাস্তব ব্যয়ের সক্ষমতাও থাকতে হয়। অতীতে দেখা গেছে, শিক্ষা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বড় থাকলেও বছর শেষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অব্যবহৃত থেকে যায়।
বাজেটের এই উদ্যোগ যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আসতে পারে। রেমিট্যান্স খাতে, আরপিএল (রিকগনিশন অব প্রায়োর লার্নিং) ব্যবস্থা চালু হলে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেশন পাবেন। এতে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে তাদের মর্যাদা ও মজুরি দুটোই বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা প্রচুর।

আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে, স্কুলপর্যায় থেকে ডিজিটাল দক্ষতার চর্চা শুরু হলে আগামী ৫-৭ বছরে একটি বড় কর্মীবাহিনী তৈরি হতে পারে যারা বৈশ্বিক ডিজিটাল শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। স্থানীয় শিল্পে, বিশেষত পোশাক শিল্পের পরবর্তী ধাপে এবং ইলেকট্রনিকস ও হালকা শিল্প সম্প্রসারণে কারিগরি দক্ষ কর্মী বড় ভূমিকা রাখতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা রপ্তানিতেও সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষ নার্স ও প্যারামেডিক কর্মীর চাহিদা বিশ্বজুড়ে তীব্র। বাজেটে নার্সিংয়ে মাস্টার্স কোর্স চালুর প্রস্তাব থাকলে এই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব।

এই প্রসঙ্গে ভিয়েতনামের উদাহরণ প্রাসঙ্গিক। নব্বইয়ের দশকে ভিয়েতনামও বাংলাদেশের মতো অদক্ষ শ্রমনির্ভর অর্থনীতি ছিল। দেশটি কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে, শিল্পের সাথে পাঠ্যক্রমের সংযোগ ঘটিয়ে এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মাত্র দুই দশকে উৎপাদন ও প্রযুক্তি রফতানিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উল্লেখযোগ্য শক্তি হয়ে উঠেছে। এই রূপান্তরের মূলে ছিল একটি সুসংগত, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি এবং সেটির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশের সামনেও একই সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই যাত্রা একটি বাজেট দিয়ে শুরু হলেও শেষ হয় না। এরজন্য চাই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষার বাধ্যবাধকতা এবং ডিজিটাল দক্ষতাকে মূলধারায় আনার সিদ্ধান্ত, এগুলো সঠিক দিকে নেয়া পদক্ষেপ। এই ঘোষণাগুলো বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানের চিত্র বদলানোর সত্যিকারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটি পূরণ করতে দরকার সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা, যোগ্য জনবল, টেকসই অবকাঠামো এবং শিল্প-শিক্ষার মধ্যে জীবন্ত সেতুবন্ধন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষায় অর্থায়নের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সঠিক পথে নেয়া সাহসী পদক্ষেপ। তবে ইতিহাস বলে, নীতির সাফল্য ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে নির্ধারিত হয়।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ আশা করে যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেটের ঘোষিত উদ্যোগগুলো শুধুমাত্র নীতিগত ঘোষণা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাব ও অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ এবং বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে বলে ঈঝঊজ প্রত্যাশা করে। একইসঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের যে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে, তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষ মানবসম্পদভিত্তিক জ্ঞান অর্থনীতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হবে এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ মনে করে, শিক্ষা খাতে এই বিনিয়োগকে জাতীয় রূপান্তরের প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যদি দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক অবকাঠামো, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আজকের এই বাজেটই আগামী দিনের কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়-এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন