কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারো চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ধারালো অস্ত্রের মহড়ায় উত্তাল রাজধানীর আদাবর-মোহাম্মদপুর এলাকা। এবার ঈদের সালামি (চাঁদা) না পেয়ে এক গার্মেন্টেস কারখানায় ঢুকে শ্রমিকদের কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। যা নিয়ে তোলপাড় চলছে এলাকায়। পুরো এলাকার চাঁদাবাজি ও ছিনতাই-হামলা বন্ধের বিচারের দাবিতে রাতভর আদাবর থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন কারাখানার শ্রমিক, মালিক ও এলাকাবাসী। দায়ের করা হয়েছে মামলা। পুলিশ অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে অন্তত ৫ জন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে। এর আগে আদাবরের ১৭ নম্বর রোডের আবির এমব্রয়ডারি মালিক মোস্তাফিজুর রায়হান জহিরের কাছে ঈদ উপলক্ষে চাঁদা দাবি করে স্থানীয় রাসেল ওরফে কালা রাসেল চক্র। জহির চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় শনিবার সন্ধ্যায় রাসেল বাহিনী কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে মারধর করে শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এরপর শ্রমিকরা কারখানার মধ্যে ঢুকে গেলে রাত সাড়ে ৯টার দিকে কালা রাসেলের নেতৃত্বে মারুফ, হাসান, রায়হান, রোমানসহ ১৫-২০ জনের একটি দল ধারালো অস্ত্র নিয়ে আবির এমব্রয়ডারি কারখানায় ঢুকে শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় তোফায়েল ও হাফিজ আহমেদ নামে দুই শ্রমিক তাদেরকে বাধা দিতে গেলে তাদেরকেও কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে হামলাকারীরা সকলকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পালিয়ে যায়। আহতদেরকে তাৎক্ষণিক ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। এরপরই ওই ঘটনার বিচারের দাবিতে শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে আদাবর থানা ঘেরাও করেন এমব্রয়ডারি কারখানার শ্রমিকরা। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার রাত ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে আদাবর আবির এমব্রয়ডারি দিকে দৌড়ে আসছে একদল যুবক। তাদের সামনে দিয়ে একজন শ্রমিক আহত অবস্থায় হামাগুড়ি দিয়ে কারখানার মধ্যে ঢুকছে। এসময় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক দৌড়ে কারখানার ভেতর ঢোকেন। এরপর রাসেল, মারুফ, হাসান, রায়হান, রোমানসহ ১৫/২০ জনের একটি দল হাতে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে কারখানার মধ্যে তাণ্ডব চালাতে থাকে। যাকে সামনে পায় তাকেই মারধর করতে থাকে। তখন কারখানার মধ্যে শ্রমিকরা ছোটাছুটি শুরু করেন। বিছুক্ষণ পর সন্ত্রাসীরা নিজেরাই বের হয়ে যায়।
ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী আবির এমব্রয়ডারির মোস্তাফিজুর রায়হান জহিরের ভাতিজা মারুফ হাসান সুমন বলেন, আমার চাচা এমব্রয়ডারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। কিছুদিন আগে কালা রাসেল বাহিনী আমার চাচার কাছে চাঁদা চায়। সেই চাঁদার টাকার জন্যই এই হামলা। তিনি বলেন, এরা মূলত আদাবর এলাকার কিশোর গ্যাং লিডার রানার লোক। তার ইশারাতেই এরা পুরো এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপকর্ম করে থাকে। জীবনের মায়ায় তাদের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলতে ভয় পায়।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আদাবর এলাকার আবির এমব্রয়ডারি কারখানায় একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে মালিক, শ্রমিক ও এলাকাবাসীরা শনিবার রাতে থানার সামনে অবস্থান নেয়। মূলত ওই কারখানায় শ্রমিকদের বেতন দেয়ার সময় ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। এরপর কালা রাসেলের আদাবরের ১৬ নম্বরের বাসায় শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে ঘেরাও করলে পুলিশ রাসেলের বাবাকে হেফাজতে নেয়। সেখান থেকে শ্রমিকরা স্লোগান দিতে দিতে বিচারের দাবিতে থানার সামনে জড়ো হয়। এই ঘটনায় আবির এমব্রয়ডারির মালিক জহির ইতিমধ্যে একটি মামলা করেছেন। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত রাসেলসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান চলছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার মামুন বলেন, শুধু আদাবর নয় চাঁদাবাজি-ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। আমরা আদাবরের ঘটনা ছাড়াও মোহাম্মদপুরের বসিলা সিটি হাউজিং ও বসিলা ৪০ ফিট এলাকায় একাধিক ব্যবসায়ীকে চাঁদার দাবিতে হুমকি দেয়ার ঘটনায় রোববার বিকালে কেরাণীগঞ্জের কলাতিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ ফারুক ওরফে কালা ফারুককে গ্রেপ্তার করেছি। শুধু তাই নয়, গ্রেপ্তারের পর এলাকায় এনে তাকে পুরো এলাকায় এলাকায় ঘুরিয়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মাইকিং করা হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে পুলিশি নজরদারি আরও বাড়ানো হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
এদিকে আদাবর এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, আদাবরের ঘটনা আমরা শুনেছি। খোঁজ নিয়ে রিপোর্ট সাবমিট করতে বলা হয়েছে। যদি সে রকম কিছু হয় তাহলে আমরা এসব বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেবো। অপরাধী কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি গত ১৯শে ফেব্রুয়ারির এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওইদিন দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটে মোহাম্মদপুরের বসিলার সিটি হাউজিং এলাকায় ৫ থেকে ৬টি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন শাহীন নামে এক গ্যাস সিলিন্ডার ব্যাবসায়ীর দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেই সময় দোকানের মালিক উপস্থিত ছিলেন না। কর্মচারী ছিলেন। মোটরসাইকেলে আসা ওই ব্যক্তিরা দোকনের কর্মচারীকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। কথা বলার একপর্যায়ে মোটরসাইকেলে আসা এক ব্যক্তি ওই দোকান কর্মচারীর হাতে ইলেকট্রিক একটি বস্তু দিয়ে শক দেন। ভুক্তভোগী ওই দোকানের কর্মচারী বলেন, ইলেকট্রিক শক দেয়ার পর তার কাছে ২ লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে মালিককে শুট করা হবে বলেও হুমকি দেয় ওই সন্ত্রাসীরা। তিনি বলেন, সেদিন দোকানে আসা সকলেই সাবেক শ্রমিক নেতা (বহিষ্কৃত) ফারুকের লোক। এছাড়াও বসিলার তিন রাস্তার মোড়ের আরেক সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা যায়, দিনে দুপুরে কয়েকজন ছিনতাইকারী ধ্বস্তাধ্বস্তির একপর্যায়ে এক পথচারীর হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে সব কেড়ে নেয়। আহত পথচারী কোনো রকমে দৌড়ে প্রাণ রক্ষা করেন।
