একেবারে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ভাগ্য। যেকোনো সময় তিনি ক্ষমতাহারা হতে পারেন। ঘোষণা দিতে পারেন পদত্যাগের। এমনটা আভাস দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স সহ বৃটিশ গণমাধ্যম। যদি সেটাই হয় তাহলে বৃটেনের রাজনীতি কতটা জটিল হয়ে উঠছে সেই চিত্রই ফুটে উঠবে। সেই ব্রেক্সিট থেকে এই ধারার শুরু। মাত্র ১১ বছরে সেখানে ৭ জন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা পরিবর্তন হয়েছে। প্রথমে ব্রেক্সিটের কারণে পদত্যাগ করেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এরপর নানা স্বপ্ন নিয়ে একে একে আসেন তেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক। আর সর্বশেষ কিয়ের স্টারমার। আগের ওইসব প্রধানমন্ত্রী যেমন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে পারেননি, সেই একই পথে এবার স্টারমারকেও পড়তে হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। কারণ, তাকে হটাতে এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়েছে অ্যান্ডি বার্নহাম। এর প্রেক্ষিতে বিবিসি লিখেছে, পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ার চাপ বাড়তে থাকায় স্যার কিয়ের স্টারমার তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন। গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স তার খবরে বলেছে, আজ সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দিতে পারেন স্টারমার। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে তিনি কাজে অব্যাহত থাকতে চান।
মন্ত্রিসভার সহযোগী পিটার কাইল বলেন, গত সপ্তাহে মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহামের বিজয় তাকে লেবার পার্টির নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ সুগম করে দিয়েছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করছেন। উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নতুন করে সিনিয়র মন্ত্রীদের তোপের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারা কার্যত বার্নহামের জন্য পথ ছেড়ে দিতে স্টারমারকে তার বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। চাপের মুখে থাকা লেবার নেতার জন্য আরেকটি ধাক্কা আসে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, স্যার কিয়ের ‘প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন’। একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে স্টারমারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, অভিবাসন ও জ্বালানি নীতিতে স্যার কিয়ের ‘ভয়াবহভাবে ব্যর্থ’ হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি উত্তর সাগরে তেল উত্তোলন বাড়ানোর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প আরও বলেন, আমি তার মঙ্গল কামনা করি! বিবিসিকে ডাউনিং স্ট্রিটের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে সাক্ষাতের পর দুই নেতা সপ্তাহান্তে আর কথা বলেন নি।
বার্নহামের বিজয়ের পরপরই স্যার কিয়ের জোর দিয়ে বলেন, নেতৃত্বের জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো চ্যালেঞ্জ এলে তিনি তা মোকাবিলা করবেন। সে ক্ষেত্রে লেবার পার্টির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নের সমর্থকদের ভোটে দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। তবে অবস্থানের কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েনসবার্গ’ অনুষ্ঠানে বলেন, প্রধানমন্ত্রী গত সপ্তাহ বা তার আগের সপ্তাহের তুলনায় আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা কী, তা নিয়ে ভাবার জন্য সময় নিচ্ছেন। তিনি বলেন, শুক্রবার তার সঙ্গে স্টারমারের কথা হয়েছে এবং তিনি নিশ্চিত যে লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আজ যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, তা দেশের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করেই নেবেন। কাইল বলেন, স্টারমারের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে কোনো প্রক্রিয়া নেই বা কোনো শক্তি কাজ করছে না- এমন ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করতে তিনি চান না। তিনি আরও বলেন, সম্ভব হলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই ভালো, তবে সরকার যেন সম্ভাব্য যেকোনো প্রক্রিয়ার মধ্যেও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
২০২০ সালের নেতৃত্ব নির্বাচন, যার মাধ্যমে স্যার কিয়ের লেবার নেতা নির্বাচিত হন, সেই নির্বাচন সম্পন্ন হতে ছয় সপ্তাহ সময় লেগেছিল। লেবারের কয়েকজন সংসদ সদস্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, একই ধরনের আরেকটি প্রতিযোগিতা দলটির সম্ভাবনাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া এমন পরিস্থিতি আর্থিক বাজারে অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত করতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে বার্নহাম রিফর্ম ইউকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে লেবারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়াতে সক্ষম হন। সাম্প্রতিক নির্বাচনী পরাজয়ের ধারার বিপরীতে এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ধারণা করা হচ্ছে, পরিবহনমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারও স্টারমারকে বিদায়ের সময়সূচি নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগেই গত মাসে একাধিক নির্বাচনে লেবারের ভরাডুবির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এবং জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড একই ধরনের আহ্বান জানান। লেবারের বহু সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে স্টারমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে অথবা বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণা করতে বলেছেন। সপ্তাহান্তে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো বার্নহাম সোমবার ওয়েস্টমিনস্টারে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বার্নহামের সহযোগীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তিনি যেন সপ্তাহান্তে পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন এবং মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও পরিবারের পরামর্শ শোনেন। বার্নহামের সমর্থকদের মধ্যে রয়েছেন লেবার এমপি ও শিক্ষা বিষয়ক সিলেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান হেলেন হেইস।
