দুর্বল হয়ে পড়েছে ভারতীয় মুদ্রা রুপি। এর ফলে বেড়েছে খরচের অংক। সঙ্গে আছে কঠোর ভিসানীতি, অভিবাসীনবিরোধী পদক্ষেপ। এসব কারণে বিদেশে পড়ার জন্য ভারতীয় যেসব শিক্ষার্থী পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদেরকে নতুন করে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। ২০২৫ সালে বিদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১২ লাখের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী ভর্তি ছিলেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রধান উৎস হিসেবে ভারত কয়েক বছর আগেই চীনকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু উল্লেখিত কারণগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে হতাশাজনক চাকরির বাজারও অনেক শিক্ষার্থীকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তারা বিবেচনা করছেন, বিদেশে যাওয়ার জন্য বিপুল ঋণের বোঝা নেয়া আদৌ সার্থক হবে কি না। এ নিয়ে অনলাইন বিবিসি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
তাতে আরও বলা হয়েছে, বহু বছর ধরে সতর্ক পরিকল্পনা করছিলেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডের ২৯ বছর বয়সী কনটেন্ট নির্মাতা প্রগতি প্রিয়া। তিনি অবশেষে এ বছর বিদেশে মাস্টার্স করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে তিনি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে পড়াশোনা করতে রোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছেন।
ইউরোপে আরও ভালো পেশাগত সুযোগের দুয়ার খুলবে- এমন আশাই করছেন তিনি। ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত হলেও একই সঙ্গে ভাবছেন, সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়েছে কি না। কয়েক মাসে ইউরোসহ বিভিন্ন মুদ্রার তুলনায় ভারতীয় রুপির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় তার পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।
প্রিয়া বলেন, এ বিষয়টি আমার রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। আমি এমন কোনো শিক্ষাঋণের বোঝা নিতে চাই না, যা হয়তো কখনোই শোধ করতে পারব না। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন লাখো মধ্যবিত্ত ভারতীয় শিক্ষার্থী। প্রিয়া তাদেরই একজন। প্রতি বছর তারা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছাড়েন। প্রিয়া বলেন, পরিকল্পনা বাতিল করার কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু আমার বাবা-মা ও বোন আমাকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। এটাই একমাত্র কারণ, যার জন্য আমি এই ঝুঁকি নিতে পারছি।
অন্য অনেকের সেই সুযোগ নেই। আগামী সেপ্টেম্বর সেশনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সংখ্যা কমে গেছে। প্রতি বছর হাজার হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থীকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো শিক্ষা পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ‘এডওয়াইজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা সুশীল সুখওয়ানি বলেন, বাজারে স্পষ্টভাবেই গতি কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত দুই বছরে আমরা ইতিমধ্যে বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে ভর্তির হার ২০ শতাংশ কমতে দেখেছি। আমার ধারণা, ভবিষ্যতে এই নিম্নস্তর থেকেও আরও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে যেতে পারে।
কঠোরতর ভিসা শর্ত ইতিমধ্যেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বৃটেন জানুয়ারি সেশনে ৭৬ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তি কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ভর্তি প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। রুপির তীব্র অবমূল্যায়ন বিদেশে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ইতিমধ্যে বিদেশে অধ্যয়নরতদের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সুখওয়ানি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী ইতিমধ্যেই টিউশন ফি-এর একটি অংশ পরিশোধ করেছে। কিন্তু গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ১০ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ কিস্তি পরিশোধের জন্য তাদের নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে এবং অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে প্রধান শিক্ষাগন্তব্য দেশগুলোর মুদ্রার তুলনায় ভারতীয় রুপির মূল্য ৩৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
যদিও বিদেশে চাকরি পেয়ে সেখানে থেকে যাওয়া কিছু স্নাতকের আয় বেড়েছে, তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অনেকের জন্য পেশাগত জীবনে প্রবেশ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত ‘নর্থ আমেরিকা অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সুধাংশু কৌশিক বলেন, তারা নিজেদের প্রশিক্ষিত বিষয়ে দক্ষ চাকরি পাওয়ার আশায় আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন রকম অর্থনীতির কাজে যুক্ত হতে হয়। আগে এসব কাজ তাদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে সাহায্য করত। এখন অনেকেই স্নাতক হওয়ার পর পূর্ণকালীনভাবে এসব কাজ করছে। তিনি বলেন, এর ফলে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারগুলোর ঝুঁকি নেয়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে দুর্বল রুপির কারণে বিদেশে পড়াশোনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
তবুও বিদেশে উচ্চশিক্ষার চাহিদা সামগ্রিকভাবে এখনো শক্তিশালী। ‘গ্লোবাল স্টুডেন্ট ফ্লোস রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী- যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া, যেগুলোকে প্রায়ই ‘বিগ ফোর’ গন্তব্য বলা হয়, সেসব দেশে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তি ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। একই সময়ে বিকল্প গন্তব্যগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। শিক্ষার্থী আবাসন প্ল্যাটফর্ম ‘ইউনিভার্সিটি লিভিং’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ময়াঙ্ক মাহেশ্বরী বলেন- জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। কারণ সেখানে টিউশন ফি তুলনামূলক কম, পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ অনুকূল, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ভালো এবং সামগ্রিকভাবে খরচের তুলনায় সুবিধা বেশি। সুখওয়ানি বলেন, শিক্ষার্থীদের বাড়তি আগ্রহের কারণে তার প্রতিষ্ঠানও এখন এসব নতুন প্রজন্মের গন্তব্যের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
প্রিয়ার জন্যও ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়াই ইতালিকে বেছে নেয়ার প্রধান কারণ ছিল। তিনি বলেন, বৃটেনে যে পরিমাণ টিউশন ফি দিতে হতো, ইতালিতে তা প্রায় অর্ধেক। আর যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা ভাবনারও বাইরে ছিল। কারণ সেখানে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে দুই বছর লাগত, যেখানে রোমে তা এক বছরেই শেষ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রবণতা বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। কারণ দেশ দুটি কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক উচ্চশিক্ষা খাত গড়ে তুলেছে। উদ্বেগ আরও বেড়েছে এ কারণে যে, চীন থেকে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমে গেলেও ভারত এখনো এই দুই দেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম বৃহৎ উৎস।
কৌশিক বলেন, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, চাকরির বাজার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান, ভিসা জটিলতা এবং বর্তমান ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিমালা সব মিলিয়ে এক ধরনের নিখুঁত সংকট তৈরি করেছে। এতে কারও লাভ হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কলেজকেন্দ্রিক শহরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বৃহত্তর অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ছে। তার মতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে সফল আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যমকে দুর্বল করে ফেলার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষাকে আমাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও লাভজনক সফট পাওয়ারের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে প্রচারের মাধ্যমে যে সাফল্য অর্জন করেছিলাম, সেখান থেকে আমরা এখন পিছিয়ে যাচ্ছি।
