বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ (সিপিডি) মনে করে, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি খাতের আয়কর কাঠামোয় বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। পাশাপাশি নতুন কর ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বেশি বাড়ছে, অথচ উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে করের দায় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম।
রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত বাজেট পর্যালোচনার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই তথ্য জানান।
ফাহমিদা খাতুন জানান, যাদের বার্ষিক করযোগ্য আয় ৬ থেকে ১৫ লাখ টাকা, নতুন বাজেটে তাদের করের দায় ১২.৫ থেকে ১৬.৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
অন্যদিকে, ৩০ লাখ টাকার বেশি আয়কারীদের ক্ষেত্রে করের দায় বাড়বে মাত্র ৭.৬ শতাংশ। তার মতে, এ ধরনের কর কাঠামো সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৮ মাসে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য থাকলেও প্রস্তাবিত বাজেটে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন নেই। শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্যÑএই চার মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ হয় কমেছে, নয় তো স্থবির রয়েছে। সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি ছাড়া বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, বিদায়ী অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬৩ শতাংশ ছিল। খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিচক্ষণ মুদ্রানীতি ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য প্রশংসনীয় হলেও সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক অত্যধিক আশাবাদী। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এসব বরাদ্দের কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে সিপিডি চিহ্নিত করেছে যে, সরকার রাজস্ব সংগ্রহে ১৮ দশমিক দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার পরিমাণ ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিপিডি’র নিজস্ব প্রাক্কলন বলছে, গত অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আদায় হতে পারে মাত্র ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এর অর্থ দাঁড়ায়, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হতে হবে প্রায় ৫৪.০৪ শতাংশ।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সম্পর্কে সিপিডি বলেছে, তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দ (যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি) একটি উচ্চাভিলাষী আর্থিক অবস্থান প্রদর্শন করে। তবে গত বছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি’র মাত্র ৩৫.০৪ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছিল, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের নিম্ন সক্ষমতারই ইঙ্গিত দেয়।
সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে (এসএসএনপি) বরাদ্দ ১৩.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে সিপিডি লক্ষ্য করেছে যে, পেনশন ব্যবস্থাপনা ও কৃষি ভর্তুকি মিলেই মোট সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের ৪৩.২ শতাংশ চলে যায়, যা মূলত সরাসরি দরিদ্রদের লক্ষ্য করে নেয়া কর্মসূচি নয়।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে উচ্চাভিলাষী আখ্যা দিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটি বাজেটের প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ ও সরকারি ব্যয় বাস্তবায়নে সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার, কার্যকর বাস্তবায়ন ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
