পোশাক বাজার দখলে নিচ্ছে চীন ও ভিয়েতনাম

সতর্কবার্তা ইউরোপ থেকে

পোশাক বাজার দখলে নিচ্ছে চীন ও ভিয়েতনাম

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এই খাত। সেই শিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপে বাংলাদেশের অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নেই। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে কমেছে বাজার অংশীদারত্ব ও পণ্যের গড় মূল্য। ফলে পরিস্থিতি শুধু সাময়িক মন্দার প্রতিফলন নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তুলছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ইউরোপে মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয় সংকোচন পোশাক খাতকে প্রভাবিত করেছে। ফলে ইইউর মোট পোশাক আমদানিও কমেছে। তবে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজার যতটা সংকুচিত হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে কমেছে দেশের রফতানি। অর্থাৎ সংকটের একটি অংশ বৈশ্বিক হলেও আরেকটি অংশ আমাদের নিজেদের।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্ব কমেছে। অন্যদিকে চীনের অংশীদারত্ব বেড়েছে। ভিয়েতনামও তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর অর্থ হলো, ইউরোপের ক্রেতারা বাজার থেকে সরে যায়নি। তারা শুধু সরবরাহকারী নির্বাচন নতুনভাবে করছে। সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান শক্তি ছিল কম খরচে বড় পরিসরে উৎপাদন। এই সুবিধা দেশকে বিশ্ব পোশাক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন বিশ্ববাজারের নিয়ম বদলাচ্ছে। ক্রেতারা শুধু কম দাম নয়, দ্রুত ডেলিভারি, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে পুরোনো শক্তির পাশাপাশি নতুন সক্ষমতাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ইউনিট মূল্য কমে যাওয়া। অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু কম পণ্য বিক্রি করেনি। আগের তুলনায় কম দামেও বিক্রি করেছে। এতে বোঝা যায়, অনেক ক্ষেত্রে বাজার ধরে রাখতে মূল্যছাড় দিতে হয়েছে। এটি স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্ডার ধরে রাখতে সাহায্য করলেও দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য সুখকর নয়। কারণ উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে কম দামে বিক্রি করে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও সহজ নয়। ঋণের সুদের হার বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায়ও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে সময়মতো ডেলিভারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেখানে এসব সমস্যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা শক্তিকে দুর্বল করছে।

এখানে ভিয়েতনামের উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। পাশাপাশি তারা উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন বাড়িয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাও উন্নত করেছে। ফলে বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।

সামনের বড় চ্যালেঞ্জ এলডিসি উত্তরণ। ২০২৯ সালের পর ইউরোপের বাজারে বর্তমানে পাওয়া অনেক শুল্ক সুবিধা আর থাকবে না। তখন প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। আজ যখন শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা অবস্থায় বাজার অংশীদারত্ব কমছে তখন সেই সুবিধা হারালে চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

তবে পরিস্থিতিকে শুধু হতাশার চোখে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তি। সবুজ কারখানার সংখ্যায় দেশ শীর্ষস্থানীয়। দক্ষ উদ্যোক্তা ও বিপুল শ্রমশক্তিও বড় সম্পদ। ফলে সঠিক নীতি ও দ্রুত সংস্কার গ্রহণ করা গেলে হারানো বাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব।

এ জন্য উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজনকারী পণ্যের উৎপাদনে জোর দিতে হবে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার ও বাণিজ্য চুক্তির দিকেও নজর দিতে হবে।

ইউরোপের বাজারে রফতানি কমার সাম্প্রতিক তথ্য তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সেই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে আরও দক্ষ, আধুনিক ও গতিশীল হতে হবে।

আজকের এই সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সংকটই নতুন সুযোগের পথ খুলে দিতে পারে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ইউরোপের বাজারে হারানো অংশীদারত্ব পুনরুদ্ধার করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতির ওপর।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন