ঢাকায় অপরাধ থামছে না, নিয়ন্ত্রণে গতি নেই

সহযোগীদের খবর

ঢাকায় অপরাধ থামছে না, নিয়ন্ত্রণে গতি নেই

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো

‘ঢাকায় অপরাধ থামছে না, নিয়ন্ত্রণে গতি নেই’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, ব্যস্ত সড়ক কিংবা বাসার সামনে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশও। ঘটনার পর মাঠপর্যায়ে কিছু আসামি গ্রেপ্তার হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশাদার এসব সন্ত্রাসী চক্রের নিয়ন্ত্রক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না পুলিশ। ফলে অপরাধ থামছে না, বরং নতুন নতুন ঘটনা ঘটেই চলেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ২১ মাসে ঢাকা মহানগরে খুনের মামলা হয়েছে ৫৯৭টি। এর মধ্যে ১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’।

একই সময়ে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৭৭৩টি। যদিও ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা অনেক বেশি বলে পুলিশ কর্মকর্তারাই মনে করেন। কারণ, অধিকাংশ ঘটনাতেই ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। কেউ কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা না নেওয়ার অভিযোগও আছে।

ঢাকায় আলোচিত ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর একটিরও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। এর মধ্যে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে যুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও কম নয়। গত ২১ মাসে কেবল ঢাকাতেই পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৪২টি।

আলোচিত না হলে ব্যবস্থা নেই

রাজধানীতে ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের ঘটনা বাড়লেও অপরাধী চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে খুব একটা অচেনা নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) করা সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীতে ১১৭টি পেশাদার অপরাধী দল সক্রিয় রয়েছে। এসব দলের সদস্যসংখ্যা ১০ থেকে ২০ জনের মধ্যে। ভাড়াটে খুন, ছিনতাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় হয় না। ফলে পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী চক্রগুলো একের পর এক ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে। পুলিশের কাছে অপরাধীদের তথ্য থাকার পরও কীভাবে তারা সক্রিয় থাকে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে মোহাম্মদপুরের আলোচিত আরও একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায়।

ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত এসব চক্রের সদস্যদের নাম-পরিচয় পুলিশের এই তালিকায় রয়েছে। এসব অপরাধী দলগুলোকে কারা পৃষ্ঠপোষকতা দেন, তাঁদের নামও রয়েছে। ঢাকায় আলোচিত খুন-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে এসব দলের সম্পৃক্ততাও পাচ্ছে পুলিশ।

সর্বশেষ ১৬ জুন আদাবরে এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর ছিনতাইকারী ধরতে মাঠে নামে পুলিশ। ওই দিনই অভিযানে গিয়ে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলামসহ দুজন ছিনতাইকারীদের হামলার মুখে পড়েন। ছিনতাইকারীরা তাঁদের কুপিয়ে আহত করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে দুজন আহত হন। পরে জানা গেল, হামলাকারীরা ডিএমপির তালিকায় থাকা মোহাম্মদপুর-আদাবরকেন্দ্রিক ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ গ্রুপের সদস্য। ডিএমপির তালিকাতেও এই দলের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় হয় না। ফলে পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী চক্রগুলো একের পর এক ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে। পুলিশের কাছে অপরাধীদের তথ্য থাকার পরও কীভাবে তারা সক্রিয় থাকে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে মোহাম্মদপুরের আলোচিত আরও একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায়। গত ৩১ মে ভোরে ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পর নূরজাহান রোডের বাসার ফটকে মা-মেয়েকে চাপাতির মুখে জিম্মি করে মালামাল ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ ও র‍্যাব সক্রিয় হয় এবং দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে।

জানা গেছে, এই পেশাদার অপরাধীদের নামও পুলিশের তালিকায় রয়েছে। পরে পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, একই চক্র গত মাসেই মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত ১০টি ছিনতাই করেছিল। কিন্তু ওই সব ঘটনা আলোচনায় আসেনি, মামলাও হয়নি, তদন্তও হয়নি।

এ বিষয়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। ফলে এসব ঘটনার তদন্তও শুরু করা যায় না।

অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত মোহাম্মদপুর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বহু বছর ধরে মোহাম্মদপুর অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে আছে। এলাকাটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে অপরাধী চক্রগুলোকে নির্মূল করা হবে।
৭ জুন মতিঝিলের ব্যস্ততম এলাকা শাপলা চত্বরের জনতা ব্যাংকের সামনে দিনদুপুরে এক মানি এক্সচেঞ্জ (মুদ্রা বিনিময়) ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার ডাকাতির ঘটনা ঘটে। চার মোটরসাইকেলে আসা আট ডাকাতের মধ্যে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে একজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। ওই ব্যক্তি এর আগে আরও চারটি ডাকাতির মামলার আসামি ছিলেন এবং পুলিশের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। সেখান থেকে নাম-ঠিকানা নিয়ে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পুলিশি ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খায়। পরে ধীরে ধীরে পুলিশ সক্রিয় হলেও বাহিনীকে পুরোপুরি পুনর্গঠন ও সক্ষম করে তোলার কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পরও পুলিশ পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বলে অপরাধ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
যদিও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এস এন নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা ছিল, সেখান থেকে উন্নতি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশিচৌকি, ব্লক রেড এবং তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, একটি ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নতুন ঘটনা ঘটছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। তা সত্ত্বেও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধজগতের দ্বন্দ্বে খুনোখুনি চলছেই

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গণ-অভুত্থানপরবর্তী সময়ে রাজধানীর অপরাধজগৎ অস্থির হয়ে ওঠে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় ১১টি হত্যার ঘটনা ঘটে।

এই ১১টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৮টির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বাকিগুলো থানা-পুলিশ তদন্ত করছে। ডিবির কর্মকর্তাদের দাবি, তারা সাতটি হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে এবং শুটার বা ঘটনায় জড়িত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারও করেছে।

তবে কোনো মামলার তদন্ত এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা যায়নি। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ছয়টি হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা মাঠপর্যায়ে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করলেও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে আদালতে উপস্থাপনের মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। ফলে মূল নির্দেশদাতারা আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন।

সর্বশেষ ঢাকার রামপুরায় খুন হন পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইয়াছিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ। ১২ জুন বেলা পৌনে ২টার দিকে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের উল্টো দিকে নিজের বাসার কাছে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এক সপ্তাহ পর, গত শুক্রবার এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর এক মাস আগে তিনি জামিনে মুক্ত হয়েছিলেন।

এই খুনে সন্দেহভাজন হিসেবে বিদেশে পলাতক থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ ওরফে মন্টির নাম এসেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়নি।

এর আগে গত ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক আলোচিত সন্ত্রাসী নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে। দেড় মাস পার হলেও এ খুনে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

মামলাটির তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে খুব বেশি অগ্রগতি নেই। কাউকে গ্রেপ্তারের আগে বিস্তারিত কিছুই বলা সম্ভব নয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টিটন হত্যার পর সন্দেহভাজন হিসেবে দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালের নাম এসেছে। এর আগেও একাধিক হত্যা এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় এই দুজনের নাম আলোচিত হলেও পুলিশ কাউকেই আইনের আওতায় আনতে পারেনি।
ঢাকার আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি হচ্ছে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়া হত্যা। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী মিরপুরে একটি দোকানে ঢুকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কিবরিয়া হত্যার ঘটনায় মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান ওরফে মামুনের নাম এসেছে। তবে তদন্তকারী সংস্থা ডিবির সূত্র বলছে, তদন্তে হত্যার নির্দেশদাতা পর্যন্ত পৌঁছানো যায়নি বলে মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের অনেককেই ডিবি এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এমনকি নির্দেশদাতার নাম এলেও ডিবি নির্দেশদাতার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। এই মামলার সঠিক তদন্ত হবে কি না, তিনি ন্যায়বিচার পাবেন কি না, সেটি নিয়ে সন্দেহ আছে বলে জানান তিনি।

তবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আলোচিত প্রায় সব হত্যা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে কয়েকটি মামলার প্রতিবেদন ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় আটকে আছে। কারিগরি প্রমাণ নিশ্চিত করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। অচিরেই অন্তত দুটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সাফল্য প্রচারে যতটা সক্রিয়, তদন্তে ততটা নয়

২০২৫ সালের ২৭ মে মিরপুর ১০ নম্বরে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে ২২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তদন্তে নেমে ওই বছরের ১৭ জুন এই চক্রের প্রধান জলিল মণ্ডলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ডিবির তদন্তে উঠে আসে এই চক্র এর আগে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ৫০ ভরি সোনা এবং ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে গুলি করে ৫২ লাখ টাকা ছিনতাই করেছে। পরে কামরাঙ্গীরচর ও ধানমন্ডির মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সব কটি মামলা তদন্ত করছে ডিবি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এরই মধ্যে এই চক্রের প্রধান জলিল মণ্ডলসহ অধিকাংশ আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছেন। তবে তারা মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি।

এই তিন মামলার ভুক্তভোগীর সঙ্গেই কথা হয়েছে প্রথম আলোর। এর মধ্যে মিরপুরে ২২ লাখ টাকা ছিনতাই এবং ধানমন্ডিতে ৫২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনার ভুক্তভোগী হতাশা প্রকাশ করেছেন। মূল আসামি ধরা পড়লেও তাঁদের টাকা উদ্ধার হয়নি। ধানমন্ডির ঘটনার মামলার বাদী কাইয়ুম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, অগ্রগতির কোনো খবর তাঁরা জানেন না। আসামি ধরা পড়লেও কোনো মালামাল ফেরত পাননি।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এসব মামলার তদন্তে অগ্রগতি আছে। কোনো কোনো মামলায় সব আসামি ধরা পড়েনি। যেমন কামরাঙ্গীরচরে ৫০ ভরি সোনা ছিনতাইয়ের মামলায় আরেকজন আসামি ধরা পড়লে আরও কিছু সোনা উদ্ধার হতে পারে। এ জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে অনেক ছিনতাইয়ের মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে বা গণমাধ্যমে আলোচিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত আসামি ধরার জন্য চাপ দেন। আলোচিত ঘটনায় আসামি ধরা পড়লে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সাফল্যের কথা প্রচার করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই মামলার তদন্তে অগ্রগতি হলো কি না, সেটি খুব বেশি তদারকি করা হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কার্যক্রম আর এগোয় না। তা ছাড়া ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। দায়িত্ব নিয়ে ঘটনা তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ওপর।

ডিএমপির ডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ফুটেজ দেখে বা প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে মাঠের অপরাধী শনাক্ত করলেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বিভিন্ন এলাকার পেশাদার অপরাধীদের ‘গডফাদারদের’ আইনের আওতায় আনতে হয়। কিন্তু তদন্তে সেভাবে গডফাদারদের নাম আসছে না। এ কারণে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন এবং বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই বন্ধ করা যাচ্ছে না। এমনও দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পর জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধ করছে।

কঠোর তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুলিশের মধ্যে এখন তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে আলোচনায় না এলে বড় ধরনের চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ঘটনাগুলোর তদন্তে অগ্রগতি কম।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (সাবেক আইজিপি) আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, এখন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের জবাবদিহি, আন্তরিকতা এবং তদারকির ঘাটতি রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় হতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের শক্ত নির্দেশনা ও জবাবদিহির আওতায় না আনলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

সাবেক এই আইজিপির মতে, প্রথাগতভাবেই খুন, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটলে পুলিশ দ্রুততম সময়ে সক্রিয় হয়। কিন্তু এখন এ ধরনের সব ঘটনায় সে রকম সক্রিয়তা দেখা যায় না।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘জল্পনা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন’। খবরে বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা মহলে আলোচনা ও গুঞ্জন রয়েছে। অনেকের সন্দেহ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এ দলটির পুনর্বাসনের জন্য দু-একটি বিদেশি শক্তির ‘গোপন’ তৎপরতা রয়েছে। এরই অংশ হিসাবে দলটির উদ্যোগে দু-একটি ঝটিকা মিছিল হচ্ছে। এছাড়া শেখ হাসিনা নিজেও একাধিকবার সাক্ষৎকার ও ভার্চুয়াল মিটিংয়ে তার ফেরার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা কী বলে-সত্যি কি হাসিনা দেশে ফিরতে পারবেন? তার বা আওয়ামী লীগের ফেরার মতো পরিস্থিতি দেশে আদৌ তৈরি হয়েছে কিনা এ প্রশ্নও উঠছে।

কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত নতুন একটি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪ মাস পার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সরকারের ভুল-ভ্রান্তি যেমন জনমনে ততটা স্পষ্ট হয়নি, তেমনি হাসিনাবিরোধী তথা গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ আছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দেশীয় জনমত বা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন কোনো পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত হাসিনা বা আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় তার ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। কারণ দেশে ফিরলেও প্রথমেই তাকে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর জন্য বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গত দেড় দশকের শাসনামল নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আত্মসমালোচনা বা অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান এখনো দৃশ্যমান নয়।

এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত তরুণ প্রজন্ম এখনো বেশ সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামীবিরোধী জনমতও দেশে বিদ্যমান। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যে আলোচনা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাস্তবতা দেখছেন না রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। বরং এ ধরনের আলোচনা অনেকাংশেই রাজনৈতিক প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডার অংশ হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বাইরে রাখা সহজ হবে না। তবে বর্তমানে দেশে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই; ফলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই দেশের রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার প্রসঙ্গ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন বলে মনে করেন না সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। যুগান্তরকে তিনি বলেন, দেশে যে অপরাধ, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। শেখ হাসিনা হোক আর যেই হোক, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে, তিনি যত বড় রাজনৈতিক নেতা বা ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষ্য কখনোই আরেক ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে না। গণতন্ত্রের নামে নতুন কোনো স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি হলে সেটিও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি হবে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতাই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া বা আওয়ামী লীগের আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই সীমিত। যুগান্তরকে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলেও সেটি মূলত দেশের বাইরে, বিশেষ করে সীমান্তের ওপারের কিছু মহল, মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগের অবস্থানরত নেতাকর্মীদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন একটি বড় রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। তাদের দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী এখনো দেশেই রয়েছেন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির মধ্যে আত্মসমালোচনা, অনুতাপ বা নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তারা অতীতের অবস্থান থেকেও সরে আসেননি, যা তাদের জনগণ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

কালের কণ্ঠ

‘চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রস্তুতি’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করবেন। এই সফর ঘিরে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

একদিকে যেমন চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুপ্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে চীনে বিডার প্রথম বিদেশি কার্যালয় চালুর উদ্যোগ, বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’, বিনিয়োগ সম্মেলন, ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) আলোচনার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। আবার স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের পরিকল্পনা এবং নতুন বাজেটে ব্যাপক কর-শুল্ক সুবিধা, সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার কৌশলগত প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হবে ২৫ জুন বেইজিংয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করছে।

এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, অগ্রাধিকার খাত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিগুলো তুলে ধরা হবে।

সরকারি সূত্র বলছে, সফর উপলক্ষে যে কটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করা হবে, এর মধ্যে রয়েছে কেরানীগঞ্জ ইকোনমিক জোনে চীনা প্রতিষ্ঠান হান্ডা গ্রুপের জন্য জমি বরাদ্দ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ডেভেলপার নিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তি। পাশাপাশি তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনা হবে।

সফরের আগে বড় অগ্রগতি এসেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পে। গত মঙ্গলবার একনেক সভায় চার হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চীন সরকার প্রায় দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সরকার বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ কেন্দ্র হিসেবে দেখছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটির ভৌগোলিক সুবিধাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হিসাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ হতে পারে। চীনা বিনিয়োগকারীদের আরো কাছে যেতে বিডা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চীনে তাদের প্রথম বিদেশি কার্যালয় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই কার্যালয়ে স্থানীয় চীনা নাগরিকদের নিয়োগ দিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, তথ্য প্রদান এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। এরই মধ্যে বিডার অধীনে একটি বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’ চালু করা হয়েছে, যা শুধু চীনা বিনিয়োগকারীদের সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করছে।

সরকারের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো চীনা অর্থায়ন নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে, চীন সরকার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) মিলিয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়ন প্রস্তাব বর্তমানে বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে চীন সরকারের অর্থায়নে অপেক্ষমাণ ৯টি প্রকল্পে ৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার, এআইআইবির অধীনে ১৭টি প্রকল্পে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার এবং এনডিবির আওতায় সাতটি প্রকল্পে ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব।

এই তালিকায় তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, মোংলা বন্দরের উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ, কনটেইনার জাহাজ ক্রয়, গ্যাস নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং রেল অবকাঠামো উন্নয়নসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ-চীন ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা এফটিএ। বেইজিং এরই মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি আধুনিকীকরণ, কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থা চালু এবং বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে।

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘পররাষ্ট্রনীতির প্রথম পরীক্ষা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আজ রোববার প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। ১৮ ঘণ্টার মালয়েশিয়া সফর শেষে কুয়ালালামপুর থেকে চীন যাবেন চার দিনের জন্য। মালয়েশিয়া সফরে মাত্র একটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। চীনে হবে মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণসহ ১৭দ্বিপক্ষীয় দলিল সই।

প্রতিবেশী ভারতের পরিবর্তে চীনকে কার্যত প্রথম সফর হিসেবে বেছে নেওয়া রাজনৈতিক গুরুত্বও বহন করছে বলে অভিমত কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের। তাঁরা বলছেন, ঢাকার নজর কৌশলগত অংশীদারিত্বে।

এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন এই অঞ্চলের রাজনীতিতে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা সবকিছুই নতুন সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম পরীক্ষা

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গুরুত্ব শুধু কোথায় যাচ্ছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কোন বার্তা নিয়ে যাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার তিনটি বিষয় সামনে আনতে চাইছে- অর্থনৈতিক অংশীদার বাড়ানো, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করা।

ভারত, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের পরিবর্তিত সম্পর্কের বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। সেই দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখছে কূটনৈতিক মহল। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা ভারসাম্যের বার্তা দিতে চেয়েছে। একই সঙ্গে চীন সফরের মাধ্যমে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রাধিকারও স্পষ্ট হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের আগের দিন গতকাল শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। তিনি মার্কিন ফুটবল দলের বিজয়কে রূপক ধরে বলেন, 'দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাজি ধরলে ভুল হবে না।'

ইত্তেফাক

‘অতীতে এত শিশুর মৃত্যু দেখেনি বাংলাদেশ’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে হামে এত বিপুলসংখ্যক শিশুর সংক্রমণ এবং মৃত্যু এর আগে কখনো হয়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সমপ্রতি হামের প্রাদুর্ভাব ও এর উপসর্গে দেশে আশঙ্কাজনক হারে শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৫ মার্চ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৬৭৭ জন শিশুর মৃত্যু হয় হাম ও উপসর্গে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৩ শিশু এবং হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫৮৪ জন। হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখের উপরে শিশু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু কারণ—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিকা না দেওয়ার কারণে শিশুদের ‘হার্ড ইমিউনিটি’ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে টিকা না থাকা, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন সময়মতো না হওয়া এবং কাভারেজ কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। যারা টিকার বাইরে ছিল, তাদের সন্তানেরা হামে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে। আগে টিকা নেওয়ার পর কি পরিমাণ এন্টিবডি তৈরি হয়েছিল তার হালনাগাদ কোণ গবেষণা নেই। ফলে কারো কারো শরীরে টিকার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে কি-না, সেটাও যাচাই করা হয় না। ফলে যাদের হার্ড ইমিউনিটি নষ্ট হয়ে যায়, আবার যারা টিকা না নিয়েও সুরক্ষিত ছিল, তারাই হামের সহজ শিকার এবং সেসব নারীদের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া শিশুরাও হামের শিকার হয়। এছাড়া অপুস্টির কারণে যে সব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল তারাও আক্রান্ত হয়। এসব কারণে হামের সংক্রমণ হচ্ছে এবং মৃত্যুও ঘটছে।

আক্রান্ত শিশুকে দেরিতে হাসপাতালে নেওয়ার কারণেও অনেকের মৃত্যু হয়। উপসর্গের তীব্রতা বোঝার আগেই অনেকে বাসায় চিকিত্সা করেন, যার ফলে শারীরিক জটিলতা (নিউমোনিয়া ইত্যাদি) বেড়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। চিকিত্সা ঘাটতিও শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ—প্রত্যন্ত অঞ্চলে হামের উন্নত ও সময়মতো চিকিত্সার অভাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে এতো শিশুর মৃত্যুর পেছনে নীতি-নির্ধারকদের কিছু ভুল সিদ্ধান্তও দায়ী। আর টিকার ঘাটতি আরো উসকে দিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাবকে। এর আগে ২০১৭ সালে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়, যা ছিল বিগত এক দশকে হামে সর্বোচ্চ প্রাণহানির রেকর্ড।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরি ইত্তেফাককে বলেন, হামে যে মানুষ মারা যেতে পারে, এই কথাটাই গত ৩০-৩৫ বছরে মানুষ ভুলে গিয়েছিল। যখন দেশে হার্ড ইমিউনিটি ছিল, তখন মায়েরা টিকা না নিয়েও সুরক্ষিত ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিকা না দেওয়ার কারণে হার্ড ইমিউনিটি একদম নষ্ট হয়ে গেল। অর্থ্যাত্ ৯৫ শতাংশের জায়গায় যখন ৫৯ শতাংশে নেমে আসল। ফলে এমন মেয়েরা যখন গর্ভবর্তী হয়ে গেল, মায়ের পেট থেকে যে শিশুরা হামের এন্টিবডি নিয়ে জন্মায়—সেটা কিন্তু আর হলো না। ফলে ঐ শিশুরা হাম আক্রান্তের সহজ শিকার হয়ে গেল। ‘মায়েরা বাচ্চাদের বুকের দুধ কম খাওয়াচ্ছে’—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আশি বা নব্বই দশকে যত মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতো—এখন তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক মা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। ফলে এটাও কারণ না।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—আইইডিসিআর এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘দেশে হামের টিকা চালু হওয়ার পরে, এতো শিশুর মৃত্যৃ হিস্ট্রিরিতে নাই। টিকার ঘাটতিই হামে এতো মৃত্যুর কারণ। আরেকটি কারণ আমাদের দেশে প্রাইমারি হেল্থ কেয়ার ব্যবস্থা ভালো না। তিনি বলেন, কোভিডের পর থেকে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পুষ্টিহীনতা এবং মৃত্যু।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘মালয়েশিয়ার ‘সিন্ডিকেট’ মামলায় নতুন মোড়’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের জনশক্তি রফতানি খাতকে নাড়িয়ে দেয়া বহুল আলোচিত ‘মালয়েশিয়া শ্রমবাজার সিন্ডিকেট’ মামলার তদন্তে এক নাটকীয় মোড় এসেছে। সাবেক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী, সাবেক শীর্ষ আমলা এবং শতাধিক রিক্রুটিং ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দায়ের করা এই মামলায় মানবপাচারের গুরুতর অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফলে ২০১২ সালের মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের মূল ধারাগুলো থেকে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে তাদের রেহাই মিলছে না পুরোপুরি; সাধারণ কর্মীদের সাথে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগে দণ্ডবিধির একাধিক ফৌজদারি ধারা মামলায় বহাল রাখা হয়েছে।

গত ২২ মে, ২০২৬ তারিখে তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের এসআই (নি:)/মো: রায়হানুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারামতে এই সম্পূরক চূড়ান্ত রিপোর্ট (বিপি ফরম নং-৪২, বাংলাদেশ ফরম নং-৫৩৬৯) আদালতে দাখিল করেন। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই তদন্তের সমাপ্তি প্রতিবেদনটি দেশের অভিবাসন খাত এবং আইনি মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযুক্তদের তালিকা

২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ডিএমপির পল্টন থানায় আলতাব খান বাদি হয়ে ১নং আসামি সাবেক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ এবং ২নং আসামি সাবেক সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীনসহ ১০৩ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন (পল্টন থানা এফআইআর নং-৬, জিআর নং-৩৬০)। মামলার এজাহারে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৩৮৫/৩৮৬/৪২৭/৩৪ ধারার পাশাপাশি ২০১২ সালের মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৬/৭/৮/৯/১০ ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। অভিযোগের মূল ভিত্তি ছিল- মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে একটি শক্তিশালী ‘মহাসিন্ডিকেট’ তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া, বিদেশে জিম্মি করা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় আদায় করা এবং পরবর্তীতে ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মানবপাচার করে কর্মীদের চরম শোষণ ও নির্যাতনের মুখে ফেলা।

অভিযুক্তদের তালিকায় সাবেক মন্ত্রী ও সিনিয়র সচিব ছাড়াও রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (৫এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড), মো: রুহুল আমীন ওরফে স্বপন (ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল), সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ (আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল) এবং ফেনীর সাবেক এমপি মো: নিজাম উদ্দিন হাজারী (সিংঙা ওভারসিজ লিমিটেড)। এ ছাড়াও দেশের শীর্ষস্থানীয় রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের মধ্যে মোহাম্মদ নূর আলী (ইউনিক ইস্টার্ন), নাফিসা কামাল ও কাশমিরি কামাল (অরবিটালস ইন্টারন্যাশনাল), শাহাদাত হোসেন তসলিম (শাহীন ট্র্যাভেলস), গোলাম মোস্তফা (প্রান্তিক ট্র্যাভেলস) এবং শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমানসহ (সাদিয়া ইন্টারন্যাশনালের) শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তদন্তে যা পাওয়া গেল : মানবপাচারের অভিযোগ ‘প্রমাণহীন’

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, মামলার বাদি মানবপাচারের যে ভয়াবহ অভিযোগ তুলেছিলেন, তার সমর্থনে নির্দিষ্ট কোনো ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বা প্রামাণ্য নথি উপস্থাপন করতে পারেননি। তদন্তের সময় বাদির কাছে বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া কিংবা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়, লিখিত অভিযোগ বা দূতাবাসে জমা দেয়া অভিযোগপত্র চাওয়া হলেও সেগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হয়। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, নথিপত্র এবং অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হলেও মানবপাচারের অভিযোগকে সমর্থন করে এমন তথ্য মেলেনি। বিদেশে পাঠানো কর্মীদের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ, আটক বা জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার বিষয়ে মামলার অভিযোগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত হলো, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ধারাগুলো প্রয়োগ করার মতো উপাদান মামলায় অবশিষ্ট নেই। এই কারণে মানবপাচার সংক্রান্ত অভিযোগকে ‘তথ্যগতভাবে অসত্য বা প্রমাণহীন’ (ফাইনাল রিপোর্ট তথ্যগত ভুল) উল্লেখ করে আদালতে এই সম্পূরক প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

তবে কেন বহাল থাকছে ফৌজদারি অভিযোগ?

মানবপাচারের গুরুতর অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলেও মামলাটি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তদন্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে আর্থিক অনিয়ম, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ক্ষতিসাধনের অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

বণিক বার্তা

‘বিশ্বব্যাপী অদক্ষতার সূচকই চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের বড় উৎস’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জাহাজ থেকে খালাস হয়ে কত দ্রুত কনটেইনার বন্দর ত্যাগ করতে পারছে সেটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি বন্দরের দক্ষতা নির্ধারণের অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব কাঠামো পর্যবেক্ষণে মিলছে ভিন্ন এক চিত্র। নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে বর্তমানে বন্দরের গড়ে আয় হচ্ছে ১৫২ ডলার। আর এর প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসছে স্টোর রেন্ট তথা কনটেইনার দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকার বিপরীতে আদায় করা মাশুল থেকে। ফলে যে সূচকটিকে বৈশ্বিকভাবে অদক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেটিই হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের বড় উৎস। এ চিত্র বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম থেকে অর্জিত রাজস্বের ওপর ভিত্তি করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে প্রতি টিইইউ (টোয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) আয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বন্দরের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজস্ব উৎস হয়ে উঠেছে স্টোর রেন্ট। এ পাঁচ মাসের হিসাবে প্রতি টিইইউতে গড়ে ৩৪ দশমিক ২৫ ডলার আয় হয়েছে, যা বন্দরের মোট পরিচালন রাজস্বের ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ বন্দরের ভেতরে কনটেইনারের অবস্থানকাল যত দীর্ঘ হয়েছে স্টোর রেন্ট খাত থেকে বন্দরের আয়ও তত বেড়েছে। অন্যদিকে বন্দরের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস কনটেইনার লোডিং-ডিসচার্জিং (জাহাজের ক্রেন ব্যবহার করে) কার্যক্রম। এ খাত থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে ৭১ দশমিক ৬৮ ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রাজস্বের ৪৭ শতাংশ।

এছাড়া কিউজিসি (কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন) চার্জ থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে ১৭ দশমিক ৯১ ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রাজস্বের প্রায় ১২ শতাংশ। লিফট অন ও লিফট অফ কার্যক্রম থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে আয় হয়েছে ৯ দশমিক ৪৩ ডলার, যা মোট রাজস্বের ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য আয়ের মধ্যে রয়েছে এক্সট্রা মুভমেন্ট, ওয়ার্ফ রেন্ট, হোস্টিং চার্জ, স্টাফিং-আনস্টাফিং প্রভৃতি।

উল্লেখ্য, এ বিশ্লেষণে শুধু অপারেটিং কার্যক্রম (কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং) থেকে অর্জিত রাজস্ব বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। নন-অপারেটিং খাতের আয় যেমন ব্যাংক সুদ (এফডিআর), জমি ও স্থাপনা ভাড়া কিংবা অন্যান্য বিনিয়োগজনিত আয় এতে অন্তর্ভুক্ত নেই। বন্দরের টার্মিনাল অপারেটররাও মূলত কনটেইনার বা কার্গো ওঠানো-নামানো এবং বন্দর ইয়ার্ডে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সংরক্ষণের বিপরীতে এ চার্জ আদায় করে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্টোর রেন্ট থেকে বেশি আয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এটি বন্দর ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতার প্রতিফলন। এটাকে অপারেটিং আয়ে অন্তর্ভুক্ত করাটাও অযৌক্তিক। বন্দরের অভ্যন্তরে কেন ৩০-৪০ হাজার কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কাস্টমস, আমদানিকারক, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের ভূমিকা ও দায় কতটুকু, সেটিও চিহ্নিত করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌স্বাভাবিক অবস্থায় কনটেইনার বন্দরে পৌঁছার তিনদিনের মধ্যেই খালাস হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটি কনটেইনার গড়ে এক সপ্তাহের বেশি সময় বন্দরে থাকে। এর পেছনে কাস্টমস প্রক্রিয়ার বিলম্ব যেমন রয়েছে, তেমনি কম খরচে সংরক্ষণের সুযোগ থাকায় কিছু আমদানিকারকও দ্রুত খালাসে আগ্রহী হন না। বর্তমানে জাহাজের জেটি পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন হলো কেন কনটেইনার দীর্ঘ সময় ইয়ার্ডে পড়ে থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ বিলম্বের কারণ সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। কনটেইনারের অবস্থানকাল কমাতে পারলেই বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা বাড়বে।’

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, জাহাজ থেকে কনটেইনার বন্দরে নামানোর পর পণ্য খালাস সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সময় বা ডুয়াল টাইম বন্দরের সক্ষমতা পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নৌ-পরিবহনমন্ত্রীকে দেয়া বন্দর কর্মকর্তাদের একটি প্রেজেন্টেশনে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিটি কনটেইনারের গড় অবস্থানকাল বর্তমানে সাড়ে নয় দিন। প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পর্যন্তই এ সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয়। কনটেইনার খালাস প্রক্রিয়া দ্রুত করার লক্ষ্যে কাস্টমস প্রি-অ্যাসেসমেন্ট অর্থাৎ আমদানির আগে বা বিল অব এন্ট্রি দাখিলের আগেই সম্ভাব্য শুল্ক ও কর নির্ধারণের উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে গ্রিন চ্যানেলের পরিসরও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এবং আমদানিকারকদের একটি অংশের বন্দরের ভেতরে কনটেইনার রেখে সুবিধাজনক সময়ে খালাস করে নেয়ার প্রবণতাও ডুয়াল টাইম দীর্ঘ হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স কার্যক্রম সম্পন্ন থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর গড়ে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্যবাহী কনটেইনার ডেলিভারির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সক্ষম।

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘চীনের সঙ্গে আলোচনায় থাকছে তিস্তা মহাপ্রকল্প’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছয় দিনের সফর শুরু হচ্ছে আজ রোববার। এর মধ্যে চীনে চার দিনের সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প, বেসরকারি বিনিয়োগ, সামরিক সহযোগিতা এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের চার বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সংযুক্ত হওয়ার বিষয়টি থাকবে মুখ্য আলোচনায়। একই সঙ্গে দেশটির সঙ্গে এ সময় ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর দুই দেশ সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি বলেন, এই সফরের মাধ্যমে ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও গভীর এবং বিস্তৃত হবে।

গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। সফরে তাঁর সঙ্গে প্রতিনিধিদলে থাকছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ ২৭ জন।

দুই দিনের মালয়েশিয়া সফরের উদ্দেশে আজ দুপুরে ঢাকা ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকেই ২৩ জুন যাবেন চীন। দুই দেশ সফর করে ২৬ জুন তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কাল সোমবার মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া শহরে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। এর পরপরই দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে।

আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও কৃষি, শিক্ষা, জনযোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপনের বিষয় থাকবে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী ও পেশাজীবী নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় স্থান পাবে। এ ছাড়া আসিয়ানের ডায়ালগ পার্টনার এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ, আরসিইপিতে যোগদান করার আবেদন জোরালোভাবে তুলে ধরে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়া হবে।

মালয়েশিয়া সফরে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের প্রত্যাবাসনে আসিয়ানের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হবে। এ ছাড়া সফরকালে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে টার্মস অব রেফারেন্স বিনিময় হতে পারে এই সফরে।

দেশ রূপান্তর

‘মালয়েশিয়া ও চীনকে কেন বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য আজ রবিবার বিকেলে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। এ কারণে দেশের ভেতরে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফরটি নিয়ে বেশ আগ্রহ আছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিবেশী ভারত, আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তারেক রহমানকে সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। প্রথম সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাবেন, এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর পর্যবেক্ষকদের আগ্রহের ফোকাসে কিছুটা পরিবর্তন আসে। অনেকে খোঁজ নিতে শুরু করেন তিনি কেন শুরুতে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিলেন? কেন তিনি পাশের প্রভাবশালী দেশ ভারত গেলেন না?

আগ্রহের আরেকটি দিক হলো চীনের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে তার আলোচনায় কী কী বিষয় আসতে পারে। আঞ্চলিক ও বৈশি^ক তাৎপর্য আছে, এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে বাংলাদেশ এবারকার চীন সফরে কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার করবে কি না, সেসব বিষয়ে দেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও বিদেশের কূটনীতিকরা খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক ক্ষেত্রে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ভারত বেশ সক্রিয়।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূতরা এবং যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার গতকাল শনিবার আলাদাভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসব সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ‘কী আলাপ হয়েছে’ সাংবাদিকরা জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রাইস্টেনসন বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রসঙ্গ টেনে কূটনৈতিক পন্থায় জবাব দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ঝুঁকি নাও থাকতে পারে, এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণে আমি এখানে এসেছি। গত রাতে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দারুণ এক জয় পেয়েছে এবং (আমরা) পরবর্তী পর্বে চলে গেছি। সুতরাং, আমি এখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশের জনগণকে উৎসাহিত করতে এসেছি, যাতে সামনের দিনে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেন। কেননা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরার ক্ষেত্রে তোমরা মোটেই ভুল করতে পারো না।’

প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ জাপানের কূটনীতিকরা আলাদাভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ‘কী আলাপ হয়েছে’ প্রশ্ন করা হলে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি স্পষ্টতই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে কথা হয়েছে।’

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় তারেক রহমান প্রথম কোন দেশে যাবেন, সে বিষয়ে আগ্রহ দেখা দেয়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে চীন যাওয়া নিয়ে দেশ-বিদেশে আগ্রহ থাকার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমাইউন কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থে আমাদের যখন যেখানে যাওয়া প্রয়োজন, সেখানেই যাব। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রে যাব, প্রয়োজনে চীনেও যাব। ভারতের সঙ্গে পরিবেশ অনুকূল হলে ভারতও যাব।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রথম পাতার খবর ‘ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম বিদেশ সফরে আজ মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের সরকারি সফরে আজ দুপুরে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি। পরে সোমবার সন্ধ্যায় চার দিনের সফরে মালয়েশিয়া থেকে চীনে যাবেন তারেক রহমান। সফরকালে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি অন্তত ২০টি সমঝোতা চুক্তি সই হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জোড়া বিদেশ সফর ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে গতকাল সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, দুই দিনের সরকারি সফরে রবিবার মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ২৩-২৬ জুন তিনি চীন সফর করবেন।

এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে। সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদল তুলনামূলকভাবে ছোট রাখা হয়েছে, যার সদস্যসংখ্যা ২৭ থেকে ২৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধিদলে থাকছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ আরও কয়েকজন।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সফরকালে আগামীকাল দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান। পরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপন নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাইবে বাংলাদেশ। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংস্কৃতিবিনিময় আর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুটি দলিল সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি সই হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সফর শেষে আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যায় চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন মঙ্গলবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক করার কথা রয়েছে। ডব্লিউইএফের বার্ষিক সভা সামার দাভোসে অংশগ্রহণকারী কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্র সচিব আরও জানান, চীন সফরের প্রথম দিন বিকালে ডব্লিউইএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী সামার দাভোসের ১৩তম বার্ষিক সভার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাবেন। বেইজিংয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে থাকবেন। বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন। দুপুরে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ শীর্ষক বিনিয়োগ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চীনের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাবেন। বিকালে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেবেন তারেক রহমান। সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। এরপর চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন