মালয়েশিয়া সফর শেষ করেই পাঁচদিনের চীন সফরে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও সমন্বিত নদী-পানি ব্যবস্থাপনা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িত তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। একইসঙ্গে পানি সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, নদী পুনরুদ্ধার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবে ঢাকা। এ ছাড়া, এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা।
চীন সফরে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন প্রমুখ। এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ২৫-২৮ জন সফরসঙ্গী থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আগামী ২৪ থেকে ২৬শে জুন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে সামনে রেখে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিস্তারিত আলোচনা হবে। পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হবে। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, নদী শাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ইস্যু। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ রয়েছে। এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরে বিষয়টি নতুন গতি পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরকালে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, উন্নয়ন অংশীদারিত্বের পাশাপাশি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
সফর উপলক্ষে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি এমওইউ সইয়ের প্রস্তুতিও চলছে। পররাষ্ট্র সচিব জানান, সফরকালে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দু’টি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হবে। এসব দলিলের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং অন্যান্য খাতের বিষয় অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরও বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সফর শেষে এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে যে, বাংলাদেশ কোন কোন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। শি জিনপিং বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে যে চিন্তাভাবনা করছেন, তা প্রশংসনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সফরসূচি: প্রস্তাবিত কর্মসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ২২শে জুন বিকালে কুয়ালালামপুর থেকে দালিয়ানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে সন্ধ্যায় সেখানে পৌঁছাবেন। পরদিন ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন-এ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রথম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। একই দিন সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে অংশ নেবেন। ২৪শে জুন ‘সামার ডাভোস’র মূল অধিবেশনে অংশ নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ট্রেনে করে বেইজিং যাবেন। সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’। বেইজিংয়ে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি’র (সিআইডিসিএ) চেয়ারম্যান এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন।
সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হবে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উদ্যোগে আয়োজিত এ ফোরামে প্রধানমন্ত্রী চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন।
২৫শে জুন বেইজিংয়ের গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন।
সফরের শেষ দিন অর্থাৎ ২৬শে জুন, চীনের ন্যাশনাল পিপলস্ কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। শি-তারেক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময় হবে। সফরের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে যৌথ ইশতেহার ঘোষণার সম্ভাবনা, যা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।
আলোচনায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা: চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি বলেন, সামরিক খাতে বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে এবং এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগও অব্যাহত আছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের মতো কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদিও সামরিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ পর্যায়ে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো বিষয়গুলো সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। ফলে এ সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর হবে এবং বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন অগ্রগতি অর্জিত হবে।
আলোচনায় সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় জোর
কূটনৈতিক রিপোর্টার
২১ জুন (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
