ভিনিসিয়ুসে উজ্জ্বল ব্রাজিল

ভিনিসিয়ুসে উজ্জ্বল ব্রাজিল

ফন্ট সাইজ:

ক্লাব ফুটবলে যার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ পুরো বিশ্ব, জাতীয় দলের জার্সিতে সেই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ঘিরে এতোদিন ছিল বড় প্রশ্ন। রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্যের তুলনায় ব্রাজিলের হয়ে তার পারফরম্যান্স ছিল এক ধূসর অধ্যায়। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ যেন ভিনিসিয়ুস নতুন এক জন্মের সাক্ষী। বিশ্বকাপের আগে প্রীতি ম্যাচ থেকে শুরু করে মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ কিংবা হাইতির বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াই! সবখানেই ফুটবল বিশ্ব মুগ্ধ হয়েছে তার পায়ের জাদুতে। যেখানে জাতীয় দলের জার্সিতে ৫১ ম্যাচে ১১ গোল, সেখানে বিশ্বকাপের দুই ম্যাচে দু’টি গোল করেছেন ভিনিসিয়ুস। অ্যাসিস্টও করেছেন দু’টি। তার অনবদ্য পারফরম্যান্সে হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়ের ম্যাচে দলের মাঝে যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে, তাতে যেন স্পষ্ট ব্রাজিল কেবল জেতার জন্যই খেলছে না, তারা খেলছে সেলেসাও ফুটবলের সেই পুরনো আভিজাত্য ফেরানোর জন্য।

যদিও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপের শুরুটা আশানুরূপ করতে পারেনি। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে আসর শুরু করেছিল দলটি। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। গতকাল হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় ব্রাজিলকে শুধু তিনটি পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর দলটির প্রকৃত সামর্থ্য সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। ম্যাচটি ছিল ব্রাজিলের জন্য আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের মঞ্চ, আর সেই মঞ্চে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তবে কুনহা দলে সুযোগ পেয়ে দুই গোল করেন। আর আগের ম্যাচের গোলদাতা ছিলেন ভিনিসিয়ুস।

নেইমারের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের আশা-ভরসার পুরোটাই নির্ভর করছে তার ওপর। ভিনিসিয়ুস জানেন, হয়তো এবার, না হয় কখনও নয়। তার পুরো ক্যারিয়ারটা দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বকাপের ওপর। আমেরিকা-মেক্সিকোতে তিনি যা করবেন, সেটার ওপর ভিত্তি করেই ইতিহাস তাকে মনে রাখবে। অন্তত প্রথম দুইটা ম্যাচে তিনি সেটা করতে পেরেছেন। ব্রাজিল দলে মন বসতে শুরু করেছে ভিনিসিয়ুসের। তিনি কী করতে পারেন, রিয়াল মাদ্রিদে সেটা প্রায়শই দেখা যায়। ক্লাব ফুটবলের বড় নাম ভেঙে পড়ে জাতীয় দলে এলেই। তবে, এবার চিত্রটা ভিন্ন। ইতিহাসের ডাক পেতে শুরু করেছেন ভিনিসিয়ুস। নেইমার জুনিয়রের আগের সেই সুদিন নেই। তিনি বয়স আর চোটের সঙ্গে লড়ছেন। কবে ফিরবেন একাদশে কেউ জানেন না। রাফিনহা নিজের সেরা ছন্দে নেই। ইনজুরি নিয়ে হাইতির বিপক্ষে মাঠ ছেড়েছেন। এই ব্রাজিলে তাই ভিনিসিয়ুসকে শুধু গোল করলে হবে না। তাকে গোল বানাতে হবে। তাকে নেতৃত্ব দিতে হবে আক্রমণের। তাকে দলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠতে হবে। সেটা তিনি করছেন বলেই ব্রাজিলের ছন্দের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

হাইতির বিপক্ষে এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিলের আক্রমণভাগের চিরচেনা ছন্দ ফিরে আসে সেই ভিনিসিয়ুসের কল্যাণে। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে তার বাড়ানো দুর্দান্ত এক ডিফেন্সচেরা থ্রু পাস ধরে বাঁ পায়ের কোণাকুণি শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন কুনহা। দুই গোলের পরই কুনহার ‘হ্যাং টেন’ সার্ফিং উদ্‌যাপনে গ্যালারিতে তখন সাম্বার ঢেউ। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে হাইতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন খোদ ভিনিসিয়ুস। বাঁ প্রান্ত দিয়ে একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে ‘ক্লিনিক্যাল’ ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ৩-০ করেন ব্রাজিলের এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে আরও অন্তত তিনটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ হাতছাড়া করে সেলেসাওরা। প্রথমার্ধের দাপটের পর বিরতির পর ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডদের এই ঝিমিয়ে পড়া রূপ কিছুটা খটকা জাগালেও, এই ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান ঠিকই দিয়ে রাখলো পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।

দ্বিতীয়ার্ধে গোল না পেলেও ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি দলের এই পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। হাইতিকে হারানোর পর এখন ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ বত্রিশে ওঠাই ব্রাজিলের কাছে মূল চ্যালেঞ্জ। ব্রাজিল, মরক্কো দুই দলেরই পয়েন্ট ৪ হলেও গোল ব্যবধানের কারণে এগিয়ে সেলেসাওরা। ব্রাজিলের পরের ম্যাচ ২৫শে জুন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। একই দিনে ‘সি’ গ্রুপের আরেক ম্যাচে মরক্কো খেলবে হাইতির বিপক্ষে। এই স্কটল্যান্ডের জয় রয়েছে হাইতির বিপক্ষেই। নকআউট পর্বে যে অবস্থাতেই উঠুক না কেন, গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে বলে মনে করেন আনচেলত্তি। হাইতি ম্যাচ শেষে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি বলেন, ‘এটি তেমনই ছিল যা আমি আশা করেছিলাম। খেলার মান উন্নত করা, কম ভুল করা, রক্ষণভাগে আরও নিয়ন্ত্রণ রাখা; রক্ষণাত্মক দিক থেকে এটি একটি ভালো ম্যাচ ছিল। আমরা উন্নতি করেছি এবং পরের ম্যাচে আরও উন্নতি করবো। নকআউট পর্ব ভালোভাবে শুরু করতে আমাদের এই গ্রুপ পর্বের পুরো সুবিধা নিতে হবে।’

ব্রাজিল সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছে ২০০২ সালে। সেবার তারা হারিয়েছিল জার্মানিকে। পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পর ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’ আর কোনো শিরোপা নেই ব্রাজিলের।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন