ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা, কী করছে ঢাকার দুই সিটি

ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা, কী করছে ঢাকার দুই সিটি

ফন্ট সাইজ:

এবারো দেশে ডেঙ্গু মশা বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে এবছর ডেঙ্গুতে ৭ জন মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু বেশি ছড়ায়। যদিও এখন বছরের অন্যান্য সময়েও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসছে। শীত ও গ্রীষ্মকালে কিউলেক্স মশা, বর্ষাকালে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজনন হয় সবচেয়ে বেশি।

ডেঙ্গু বিষয়ক একটি জরিপ চালিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ফলাফলে ডিএসসিসি জানিয়েছে, ডিএসসিসি এলাকার ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে বেশি বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে পরিদর্শন করা বাড়িগুলোর মধ্যে ২৮১টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। শনাক্ত হওয়া স্থাপনাগুলোর মধ্যে বহুতল ভবনে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, স্বতন্ত্র বা একক বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ ও আধা পাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া যায়। এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, বালতিতে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও প্লাস্টিকের ড্রামে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু নিয়ে এখন পর্যন্ত এবছরের জরিপের কোনো তথ্য জানায়নি।

মশা নিধনে কোটি কোটি টাকা বাজেট, তবুও করা যাচ্ছে না নিয়ন্ত্রণ: শুধুমাত্র ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিধনে প্রতি অর্থবছরে কোটি কোটি টাকা বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। খরচও হচ্ছে। এরপরও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তথ্য মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৮৭ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৩ দশমিক ২৫ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৯ দশমিক ৩০ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭০ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮৫ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭৬ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৪ দশমিক ৫০ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মশক নিধনে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৫০ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৫ দশমিক ৬০ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩২ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০ দশমিক ২ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১ দশমিক ২ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৪ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৩ দশমিক ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে।

মশক নিধনে দু’সিটির পদক্ষেপ: মশন নিধনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো চিহ্নিত করে মার্চ-মে বিশেষ মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করেছে ডিএনসিসি। ২৫টি উচ্চঝুঁকির ওয়ার্ডে মোট ৫৩টি বিশেষ ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা হাতে নেয় ডিএনসিসি। এডিস মশার প্রজনন না ঘটে, সেজন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিধন কার্যক্রম এবং ‘ক্লিন স্কুল, নো মস্কিটো’ ধরনের কর্মসূচি চালু করেছে, যেখানে স্কুলভিত্তিক সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম চালু করে মার্চের দিকে। মশক নিধনে ১৮০ দিনের কর্ম পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

ডিএসসিসি’র জরিপ অনুযায়ী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি ওয়ার্ডে পাঁচদিনের বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ চালু করেছে; পরে মাঝারি ঝুঁকির ৩৬টি ওয়ার্ডেও একই ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়াও বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে, গত বছরের ২৭শে মে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। নতুন পরিপত্রে কমিটির সুনির্দিষ্ট কিছু কার্যপরিধি ঠিক করে দিয়ে কমিটি পুনঃগঠন করেছে সরকার।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মানবজমিনকে বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য দেড় মাস আগ থেকেই বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা। বিশেষ করে ঈদের আগ পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের ১শ’ এলাকায় পরিবহনে চড়ে গানের তালে তালে ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ মূলত মানুষের হাতে। মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য আমরা লিফলেট বিতরণ করছি। সেগুলো আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি বিতরণ করার জন্য। তাছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গিয়ে মতবিনিময় সভা করেছি ডেঙ্গু বিষয়ে। মসজিদের খতিবদের অনুরোধ করা হয়েছে যাতে তারা জুমার নামাজের বয়ানে ডেঙ্গু নিয়েও সচেতন করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, ডেঙ্গুর বিষয়টি এখন আর শুধু সিটি করপোরেশনের ব্যাপার না। এখন ডেঙ্গু তো সারা দেশ জুড়ে হচ্ছে। সেজন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে শুরু করে সব মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিতে হবে। সারা দেশ জুড়ে যত পৌরসভা আছে, সিটি করপোরেশন আছে, ইউনিয়ন পরিষদ আছে, সকলে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দুটো কার্যকর উদ্যোগের কথা জানিয়ে ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, একটা হলো, যেখানে পানি জমে- ছোট ছোট কন্টেইনারে, বিভিন্ন পাত্রে; এই পানি জমতে দেয়া যাবে না। আর যেখানে পানি ফেলে দেয়া যাবে না, সেখানে লার্ভিসাইডিং দিতে হবে।

এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে কিছু পরামর্শ দেন ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল, বিশেষ করে বিভিন্ন পাত্রে জমা পানি, ফেলে দেয়া। এখন এই কাজটাতে হোম-টু-হোম অ্যাপ্রোচে যাওয়া যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষকে সংযুক্ত করতে হবে এই কাজে। কীটনাশক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারে না। কিউলেক্সে যেটা পারে, এডিসে সেটা পারে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পন্থা আছে, যেমন-পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ, অন্য জীবকে দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ অথবা কীটনাশকের ব্যবহার এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে এসব কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজের উদ্ভাবিত কেবি মডেল বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন এই গবেষক। তিনি জানান, এই মডেল পাঁচ বছর কার্যক্রম চালাতে পারলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন