রাজধানীর অলিগলিতে বিশ্বকাপের উন্মাদনা

রাজধানীর অলিগলিতে বিশ্বকাপের উন্মাদনা

ফন্ট সাইজ:

ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তাপে আবারো রঙিন হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই এখন বিশ্বকাপের আমেজ। রাজধানীর অলিগলি, মহল্লা, ছাদ, দোকানপাট ও সড়কের দু’পাশ জুড়ে শোভা পাচ্ছে প্রিয় দলের পতাকা। কোথাও চলছে সমর্থকদের শোভাযাত্রা, কোথাওবা রাতভর চলছে দল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও উৎসব, কেউ পছন্দের দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও অংশ নিচ্ছেন এই উন্মাদনায়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয় দলের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং নিজেদের সাজিয়ে তুলছেন দলীয় রঙে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দলের পতাকায় ছেয়ে গেছে সড়ক ও আবাসিক এলাকা। অনেক স্থানে কয়েকশ’ ফুট দীর্ঘ পতাকা টানিয়ে নিজেদের সমর্থন জানান দিচ্ছেন ভক্তরা। বিশ্বকাপকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় আয়োজন করা হচ্ছে র‌্যালি ও শোভাযাত্রা।

আবার এলাকার সবাই মিলে বড় স্ক্রিনে দেখছেন খেলা। সমর্থকরা প্রিয় দলের জার্সি পরে, হাতে পতাকা নিয়ে স্লোগান ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে অংশ নিচ্ছেন এসব আয়োজনে। চায়ের দোকান ও পাড়া-মহল্লার আড্ডায় এখন ফুটবল ঘিরেই তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ।
এরই ধারাবাহিকতায় পুরান ঢাকার টিকাটুলির একটি সরু গলিও যেন রূপ নিয়েছে ক্ষুদ্র এক ফুটবলজগতে। স্বামীবাগের কেএম দাস লেন এখন সবার কাছে পরিচিত ‘ফিফা গলি’ নামে। গলির দেয়ালে আঁকা হয়েছে ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তিদের ছবি। প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরে দেখছেন ফুটবল তারকাদের প্রতিকৃতি।

বড় পর্দায় খেলা দেখায় বাড়ছে উৎসবের আমেজ: বিশ্বকাপের উন্মাদনায় গা ভাসাতে বড় পর্দায় খেলা দেখছেন নগরবাসী। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, শহীদুল্লাহ হল মাঠ, জগন্নাথ হল মাঠ, মহসিন হল মাঠ ও হলপাড়ায় শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে খেলা উপভোগ করছেন। এ ছাড়া পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, রায় সাহেব বাজার, নারিন্দা ও টিকাটুলির বিভিন্ন এলাকায়ও বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই ধরনের আয়োজন দেখা গেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকাতেও।

ফুটবলপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হওয়া টিএসসিতে প্রতিদিনই জড়ো হচ্ছেন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রিয় দলের খেলা দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক সমর্থক খেলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই উপস্থিত হচ্ছেন। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসছেন খেলা দেখতে। কেউ জার্সি গায়ে আবার কেউ পতাকা হাতে নিয়ে খেলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই উপস্থিত হচ্ছেন। অনেকে আবার বাঁশি বাজিয়ে, স্লোগান দিয়ে পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। প্রতিটি গোলের পর লাফিয়ে উঠে উল্লাস প্রকাশ করছেন সমর্থকরা। খেলা শেষে করছেন মোড়ে বিজয় মিছিল।

চায়ের দোকানে পর্তুগালের ম্যাচ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, আমার বাসা পল্টনে কিন্তু বন্ধুদের নিয়ে টিএসসিতে খেলা দেখি। বড় পর্দায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার অনুভূতি আলাদা। একসঙ্গে খেলা উপভোগ করা যায়, দল নিয়ে আলোচনা করা যায়। পুরো বিষয়টি আনন্দের। আবার জেতার পর বাঁশি বাজানো, শোভাযাত্রা বের করা এগুলো জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকে।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা শাকিল হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকে আর্জেন্টিনার সমর্থক। বড় পর্দায় খেলা দেখেছি পরিবারের সকলকে নিয়ে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের খেলা দেখতে মিস করি না। ছোট থেকে বৃদ্ধ বাংলাদেশে ফুটবল খেলাকে সবাই উপভোগ করেন। সাধারণত অন্য কোনো খেলায় এমন উৎসব দেখা যায় না।
জার্সি-পতাকা কেনার হিড়িক: বিশ্বকাপের উন্মাদনায় গা ভাসাতে প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কিনতে দোকানে ভিড় করছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়ে জার্সির দোকানগুলোতে যেন ঈদের আমেজ বয়ে যাচ্ছে। গুলিস্তানের ফুটপাথ ও টুইন টাওয়ারসহ বিভিন্ন জার্সির দোকানে দেখা যায়, ছোট থেকে বড়- সব বয়সী মানুষই মেতে উঠছেন বিশ্বকাপের আনন্দে। ক্রেতাদের উপস্থিতিতে দোকানিদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সারা বছর ফুটপাথে শার্ট, প্যান্ট ও টি-শার্ট বিক্রি করলেও এই সময়ে লাল, নীল, সবুজ, হলুদ ও আকাশীসহ বাহারি রঙের জার্সি সাজিয়ে রেখেছেন হকাররা। এদিকে, জার্সি কেনার পর তাতে প্রিয় খেলোয়াড় কিংবা নিজের নাম লেখানোর প্রবণতাও বেড়েছে। জার্সিতে নিজের পছন্দের খেলোয়াড়ের নাম ও নিজের নাম লেখাতে স্ক্রিন প্রিন্টের দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।

গুলিস্তানের ফুটপাথে জার্সি বিক্রেতা সাগর হোসেন বলেন, সারা বছর ফুটপাথে শার্ট, প্যান্ট ও টি-শার্ট বিক্রি করি। বিশ্বকাপের জন্য জার্সি বিক্রি করছি। সবচেয়ে বেশি জার্সি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনার। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসে। তাই এই সময়ে জার্সি বিক্রিতে মনোযোগ দিয়েছি। সাধারণ মানের জার্সি ১৫০ টাকা আর প্লেয়ার ভার্সন ৩৫০ টাকায় বিক্রি করছি।
গুলিস্তানের মুসাইব স্পোর্টসের বিক্রেতা মাসুদ বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে আমাদের জার্সি বিক্রি অধিক বেড়ে গেছে। এই মৌসুমে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি বিক্রি হয়।

টুইন টাওয়ারের চতুর্থ তলায় জার্সিতে নিজের পছন্দের খেলোয়াড়ের নাম লেখাচ্ছিলেন আশরাফ হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্বকাপে সকলে পছন্দের দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়ায়- এটাই উৎসবমুখর পরিবেশ। ছোট থেকে বৃদ্ধরা ফুটবল খেলা নিয়ে বেশ উৎসাহী থাকে। বিশ্বকাপ এলেই বন্ধুদের মধ্যে আলাদা একটা প্রতিযোগিতা কাজ করে। কে কোন দলের সমর্থক, সেটা দেখানোর জন্য সবাই জার্সি কিনছে। আমরাও কয়েকজন মিলে একই দলের জার্সি নিয়েছি, যাতে খেলা দেখার সময় আলাদা একটা পরিবেশ তৈরি হয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন