যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো প্যাসিফিক কৌশল থেকে ‘ইন্দো’ বাদ কীসের ইঙ্গিত?

ফন্ট সাইজ:

ভূরাজনৈতিক সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের সামপ্রতিক এক সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। আট বছর আগে ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ করা হয়েছিল। এবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে কমান্ডটির পুরনো নাম ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ পুনর্বহাল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার জানিয়েছে, এটি মূলত ঐতিহাসিক নাম পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত। ১৯৪৭ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত এই কমান্ড দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ নামেই পরিচালিত হয়ে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, বিষয়টি কেবল ভাষাগত বা প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এর পেছনে বৃহত্তর কৌশলগত বার্তা থাকতে পারে। যা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক অগ্রাধিকার পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে।

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন প্রথম মেয়াদে কমান্ডটির নাম পরিবর্তন করে ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ করে। সে সময় মার্কিন কৌশলগত নীতিতে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে একক কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ওই পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতের কৌশলগত গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয় এবং একই সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার একটি বিস্তৃত কৌশলগত কাঠামো গড়ে তোলে। সামপ্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান পুনর্বিবেচনা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আবারো ‘ইন্দো’ শব্দ বাদ দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কমান্ডের ঐতিহ্যগত নাম পুনর্বহাল করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বাহিনীর ঐতিহাসিক পরিচয় ও ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে। ঘোষণায় বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠন, কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং অসংখ্য মানবিক ও যৌথ সামরিক অভিযানে এই কমান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, কমান্ডের দায়িত্বপূর্ণ এলাকা- পশ্চিম মার্কিন উপকূল থেকে ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার প্রতি প্রতিশ্রুতিও বজায় থাকবে বলে জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, নাম পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কৌশলগত বার্তা পুনর্বিন্যাস করছে, যদিও বাস্তব সামরিক কাঠামো বা দায়িত্বে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা মূলত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামো, যেখানে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং চীনের প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত কয়েক বছরে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা দেশের কূটনৈতিক নীতির অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে ঢাকা নিজস্ব ‘ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক’ ঘোষণা করে, যেখানে সমুদ্র নিরাপত্তা, অবাধ বাণিজ্য, সংযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিতে বাংলাদেশের নিজস্ব স্ট্র্যাটেজি ও অটোনমি থাকা প্রয়োজন। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের টানাপড়েনের ভেতরে বাংলাদেশের সরাসরি ঢুকে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের উচিত তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং বহুপক্ষীয় ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়া। তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি হলো তার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান। বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব বা পুনর্গঠনের মধ্যে না গিয়ে নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন