সিলেটে মাজার পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। প্রশাসন যতই কঠোর হচ্ছে মাজারের খাদেম পক্ষ ততই ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। বৃহস্পতিবার রাতে ভক্তদের পক্ষ থেকে মিছিলও করা হয়েছে। পক্ষ- বিপক্ষে দু’দিকেই অবস্থান মানুষের। তবে অনড় অবস্থানে সিলেটের জেলা প্রশাসক সরওয়ার আলম। আয় ও ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ রাখতে হযরত শাহজালাল (র.) মাজারে দান বাক্স স্থাপনের পর এবার শাহ পরান (র.) মাজারে একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। সিলেটের দুটি মাজার প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাস। বংশ পরম্পরায় মাজার দুটি পরিচালনা করছেন খাদেমরা। প্রশাসন সেখানে হস্তক্ষেপ করেনি। অভিযোগ রয়েছে; মাজারের আসা দান-খয়রাতের কোনো হিসাব নেই। খাদেম পক্ষ দাবিদার অংশ ওই টাকা নিজেরাই নিজেদের উন্নয়ন করেন। এমনকি মাজার দুটির অনেক জমিও বেদখল করা হয়েছে। এ নিয়ে দুটি মাজারেই স্থানীয়দের সঙ্গে খাদেম পক্ষের বারবারই বিরোধ দেখা দেয়।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন- দুটি মাজার পরিচালনায় সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক নেতাদেরও হস্তক্ষেপ থাকে। তারাও সেখান থেকে ভাগ পান। কেউ কেউ আবার সরাসরি মাজার পরিচালনায় জড়িত রয়েছেনও। এই অবস্থায় এবার সিলেটের জেলা প্রশাসক মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে সরব হয়েছেন। তার এই সরব হওয়ার পেছনের কারণও রয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন থেকে কয়েক মাস আগে মাজারের সার্বিক বিষয় জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছিল। পত্রটি পরিকল্পনা কমিশনে যাওয়ার পর মাজার পরিচালনার সার্বিক বিষয় ও আয়-ব্যয়ের হিসাবের বিষয়টি জানতে জেলা প্রশাসককে পত্র দেয়া হয়। কমিশনের পত্র পাওয়ার পর চলতি মাসের শুরুতেই জেলা প্রশাসক দুই মাজারের খাদেমদের এ ব্যাপারে পত্র দেন। একই সঙ্গে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল করতে নির্দেশ দেন। তবে জেলা প্রশাসকের পর পর দুটি বৈঠকে খাদেম পক্ষ সাড়া দিলেও কোনো হিসাব দাখিল করেননি। বরং মাজারে এ ‘হস্তক্ষেপে’ তারা বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গত ১২ই মে জেলা প্রশাসক শাহজালাল (র.) মাজার এলাকায় পরিদর্শন করেন। তিনি সবকিছু তদারিক করে জানান- সরকার মাজারে ব্যাপক উন্নয়ন করতে চায়। মাজারকে ঘিরে সরকার মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
এজন্য মাজারের সবকিছুতে স্বচ্ছতা আনার কাজ চলছে। তার এই পরিদর্শনের পর বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ নিয়ে মাজার এলাকায় যান। সেখানে তিনি পূর্বের খাদিম পক্ষের সকল দানবাক্স ও ডেগ সিলগালা করে দেন। তার জায়গায় প্রশাসনের তরফ থেকে নতুন করে দানবাক্স বসানো হয়েছে। এসব দানবাক্সে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ও সঙ্গে নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মাজারের দানবাক্স প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খাদেম পরিবারের সদস্য ও ১নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না। তিনি জানিয়েছেন- প্রশাসন যা করছে তাতে বিএনপি ও সরকারের ক্ষতি করা হচ্ছে। এ মাজারে জেলা প্রশাসন বা ওয়াক্ফ এস্টেটের কোনো কিছু করার নেই। এ নিয়ে খাদেমদের পক্ষে হাইকোর্টের রায় রয়েছে। তিনি বলেন- মসজিদ ও মাজারের উন্নয়নে খাদেম অংশের ভূমিকা বেশি।
অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যারা এসব করছে তারা মাজার ও ওলি আউলিয়া বিরোধী। তারা জেলা প্রশাসককে ভুল বুঝিয়ে এসব করছে বলে জানান তিনি। দরগাহের মোতাওয়াল্লি সরেকুম ফতেহ আমান উল্লাহ শুক্রবার বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- দরগাহের টাকা খাদেমরা যে সব খেয়ে ফেলে সেটা সত্য নয়। মাজারের একাংশ উন্নয়ন ও একাংশ কর্মচারীদের বেতনসহ নানা কাজে ব্যয় করা হয়। আমরা বারবার জেলা প্রশাসককে এসব বিষয় বোঝাতে চাচ্ছি। তিনি বলেন- মাজার পরিচালনায় কোনো অস্বচ্ছতা নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশে সব পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহে সাপ্তাহিক মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মাজারে আসা ভক্ত ও আশেকানরা মাজার পরিচালনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় মাজার এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। এদিকে- শুক্রবার জুমার নামাজের আগে হযরত শাহ পরান (র.) দরগাহে যান জেলা প্রশাসক সরওয়ার আলম।
তিনি শাহ পরান (র.) মাজার পরিচালনায় আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে কথা বলেন। প্রশাসন এ ব্যাপারে খাদেম পক্ষকে সহায়তা করবে বলে অবগত করেন। পরে জুমার নামাজের সময় মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে তিনি বক্তব্য রাখেন। বলেন- মাজারে টাকা সরকার নিতে চায় না। তবে আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা রাখতে চায়। এজন্য তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। ডিসি বলেন- দুটি মাজারের উন্নয়নের জন্য সরকারের তরফ থেকে মাস্টার প্ল্যান করা হচ্ছে। মাজারে মুসল্লিদের সুবিধার অনেক কিছুই অনুপস্থিত। এজন্য উন্নয়ন ও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতার ব্যাপারে সরকার আন্তরিকতা দেখাচ্ছে বলে জানান তিনি।
