নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির কাছে ফুটবল এক আবেগের নাম। শৈশব থেকেই তিনি ফুটবলের ভক্ত। প্রথম প্রেম শুরু হয় ইংল্যান্ডের পেশাদার ফুটবল ক্লাব আর্সেনাল দিয়ে। আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম রাজনীতিবিদ। মজার ব্যাপার হলো ২০২৬ বিশ্বকাপে অন্যতম আয়োজক শহর নিউ ইয়র্ক। এ শহরেই অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল ম্যাচ। তাই এই শহরের বাসিন্দাসহ অতিথিরা যেন আরামে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিয়েছে মামদানির প্রশাসন। তিনি ফুটবলের উন্মাদনাকে সাধারণের নাগালে রাখতে নিয়েছেন নানা উদ্যোগ। যেখানে ফুটবলের প্রতি মামদানির আলাদা অনুরাগ স্পষ্ট। সমপ্রতি দ্য অ্যাথলেটিক-এর ‘হোয়াই আই লাভ দ্য বিউটিফুল গেম’ সিরিজে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ফুটবল- স্মৃতি, প্রিয় ক্লাব আর্সেনাল এবং বিশ্বকাপ নিয়ে নানা ভাবনার কথা তুলে ধরেন জোহরান মামদানি। নিউ ইয়র্ক সিটির এই মেয়র বলেন, এটি এক প্রজন্মে একবার আসা সুযোগ। আমরা চাই- এই বিশ্বকাপ এমন হোক, যেখানে আরও বেশি মানুষ ফুটবলের প্রেমে পড়বে। শুধু এমন একটি বিশ্বকাপ নয়, যেখানে কিছু মানুষ মাঠে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
উগান্ডায় জন্ম নেয়া মামদানির ফুটবলপ্রেমের শুরু পরিবার থেকেই। তিনি জানান, তার চাচার কাছ থেকেই আর্সেনাল সমর্থক হয়ে ওঠেন। ছোটবেলায় আর্সেনাল খেলোয়াড়দের ফ্রিজ ম্যাগনেট সংগ্রহ করতেন। বিশেষ করে ২০০৩-০৪ মৌসুমে অপরাজিত থেকে প্রিমিয়ার লীগ জেতা আর্সেনাল দলের প্রতি ছিল তার বিশেষ টান। সেই দলের আফ্রিকান ফুটবলারদের মধ্যে লরেন, কোলো তোরে, ইমানুয়েল এবুয়ে এবং নওয়ানকো কানু ছিলেন তার প্রিয়দের তালিকায়।
শৈশবে উগান্ডার কাম্পালায় ফুটবল খেলতেন তিনি। পরে পরিবারসহ নিউ ইয়র্কে চলে আসার পরও খেলার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় ছিল। শুরুতে স্ট্রাইকার হিসেবে খেললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাঠে তার অবস্থান পিছিয়ে যায়। হাসতে হাসতেই মামদানি বলেন, এখন আমার খেলার ধরন হলো রক্ষণভাগে থাকা, বলকে সামনে রাখা, প্রতি ২০ বা ৩০ মিনিটে একবার প্রাণপণ দৌড় দেয়া, তারপর পরের পাঁচ মিনিট খুব একটা ভালো না খেলা।
ফুটবলের প্রতি মামদানির অনুরাগ মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জনপ্রিয় ভিডিও গেম ‘ফুটবল ম্যানেজার’-এরও ছিলেন একনিষ্ঠ ভক্ত। গেমটির বিভিন্ন সংস্করণ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই গেম খেলে সময় কাটিয়েছেন। এমনকি হারার পর ম্যাচ পুনরায় খেলার জন্য গেম বন্ধ করে আবার চালু করার কথাও স্বীকার করেন। স্কুলজীবনের ফুটবল স্মৃতিও তার কাছে বিশেষ। একবার কোচ দলের দুই ফরোয়ার্ডকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে এক সতীর্থ সম্পর্কে বলেছিলেন, তার প্রতিভা আছে, দক্ষতা আছে। আর মামদানির ক্ষেত্রে বলেছিলেন, তার আছে চেষ্টা, আছে পরিশ্রম, সে নিজের সর্বোচ্চটা দেয়। সেই স্মৃতি মনে করে এখনো প্রমোদ পান মামদানি। যদিও ওই মৌসুমে তিনি এবং তার সতীর্থ দুজনেই সমান আটটি করে গোল করেছিলেন।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তার প্রিয় গোল উদ্যাপনের কথাও। এ ক্ষেত্রে তিনি স্মরণ করেন ইতালিয়ান স্ট্রাইকার মারিও বালোতেল্লিকে। বিশেষ করে ‘হোয়াই অলয়েজ মি?’ লেখা টি-শার্ট দেখিয়ে করা তার বিখ্যাত উদ্যাপন এখনো মামদানির প্রিয়। তবে পুরো সাক্ষাৎকারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপে নিউ ইয়র্কবাসীকে যে যে সুবিধা দিলেন মামদানি: এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক শহর নিউ ইয়র্ক। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে টুর্নামেন্টের ফাইনালসহ মোট আটটি ম্যাচ। এই আয়োজনকে ঘিরে শহরের প্রশাসনিক নেতৃত্বে রয়েছেন মামদানি। কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ টিকিটের মূল্য এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই তিনি ফিফা’র টিকিট নীতির সমালোচনা করে আসছিলেন। ডায়নামিক প্রাইসিং বন্ধ করা, টিকিট পুনর্বিক্রয়ে নিয়ন্ত্রণ আনা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক টিকিট সংরক্ষণের দাবি তুলেছিলেন তিনি। যদিও সব দাবি বাস্তবায়ন হয়নি, তবে ফিফা’র সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিউ ইয়র্কবাসীর জন্য ৫০ ডলার মূল্যের এক হাজার টিকিট নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
লটারির মাধ্যমে এসব টিকিট বিতরণ করা হয়েছে। মামদানি মনে করেন, এই উদ্যোগ বিশ্বকাপকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সাহায্য করবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা শুধু এক হাজার টিকিট নিশ্চিত করিনি, যেসব ফ্যান ফেস্টে প্রবেশমূল্য রাখার পরিকল্পনা ছিল সেগুলোও বিনামূল্যে করতে পেরেছি। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার বৈঠকের প্রসঙ্গও উঠে আসে সাক্ষাৎকারে। বিশ্বকাপের গুরুত্ব সম্পর্কে উভয়ের মধ্যে এক ধরনের অভিন্ন উপলব্ধি রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে আলোচনায় তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ফুটবল মূলত শ্রমজীবী মানুষের খেলা এবং বিশ্বকাপেও সেই চেতনার প্রতিফলন থাকা উচিত। তার ভাষায়, ফুটবলের মূলে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ। আমরা চাই মানুষ নিজেদের এই খেলার অংশ হিসেবে দেখতে পারুক। অনেক নিউ ইয়র্কবাসী ভাবছে তারা টেলিভিশনে খেলা দেখার খরচই কীভাবে বহন করবে। সেখানে হাজার হাজার ডলারের টিকিট তাদের নাগালের বাইরে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে পরিবহন ব্যয়ও তাকে উদ্বিগ্ন করেছে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ম্যাচ দেখতে যাওয়া সমর্থকদের জন্য নিউ জার্সি ট্রানজিটের যাতায়াত খরচ প্রায় ৯৮ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও শুরুতে তা আরও বেশি ছিল। এ বিষয়ে মামদানি বলেন, বিশ্বকাপ আয়োজন কোনো শহরের জন্য অর্থ উপার্জনের প্রকল্প হওয়া উচিত নয়, বরং যত বেশি মানুষকে এই অভিজ্ঞতায় অংশ করা যায়, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন আর কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, যেখানে একটি ম্যাচ দেখতে যাওয়ার জন্য ট্রেন ভাড়া ৯৮ ডলার দিতে হয়। সমর্থকদের জন্য বিষয়টি যত সহজ করা যায়, ততই ভালো।
আর্সেনাল প্রসঙ্গেও কথা বলেন মামদানি। সমপ্রতি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে পিএসজি’র কাছে পরাজয় এখনো তাকে কষ্ট দেয়। তবে কোচ মিকেল আর্তেতার ওপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি মনে করেন, শিরোপা জিততে হলে কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেমন ডেভিড রায়াকে দলে আনার জন্য অ্যারন র্যামসডেলকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত। নতুন মৌসুমে আর্সেনালের আক্রমণ ভাগে আরও গতি এবং সৃজনশীলতা দেখতে চান তিনি। তবে শুধু তারকা ফুটবলার কেনা নয়, বিশ্বকাপের মাধ্যমে নতুন কোনো অচেনা প্রতিভার আবির্ভাব দেখার আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেন। মামদানি বলেন, আমি সেই সময়টাকে খুব ভালোবাসি, যখন বিশ্বকাপে কোনো অচেনা খেলোয়াড় নিজেকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। আমি চাই আবার এমন কাউকে দেখতে, যে এই টুর্নামেন্ট থেকেই আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে উঠবে।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে ফিরে যান ২০০২ সালে বিশ্বকাপের স্মৃতিতে। তখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর। সেনেগালের ঐতিহাসিক অভিযানের কথা এখনো তার মনে গেঁথে আছে। উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্সকে হারানো, সুইডেনের বিপক্ষে অরি কামারার গোল, এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের কাছে হৃদয়ভাঙা পরাজয়- সবই যেন আজও চোখের সামনে ভাসে। নিউ ইয়র্ক মেয়রের কাছে সেটি ছিল ‘অঘটনের বিশ্বকাপ’। আর এখন, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তার প্রত্যাশা একটাই- নিউ ইয়র্কের নতুন প্রজন্মও যেন এমন কিছু স্মৃতি তৈরি করতে পারে, যা তারা বহু বছর ধরে বয়ে বেড়াবে।
সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক
