ফিফা ও বিশ্বকাপের অন্ধকার অধ্যায়

ফিফা ও বিশ্বকাপের অন্ধকার অধ্যায়

ফন্ট সাইজ:

১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপ। সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল দু’টি ম্যাচেই রেফারির দায়িত্বে ছিলেন এক তরুণ সুইডিশ। টুর্নামেন্টের ঠিক আগের রাতে ইতালির ফ্যাসিবাদী একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে তিনি নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন কি না, কিংবা স্বাগতিক দলকে জেতানোর কোনো গোপন চুক্তি হয়েছিল কি না তা নিয়ে আজো ফুটবলের আকাশে সন্দেহের মেঘ কাটেনি। স্পষ্ট প্রমাণ না মিললেও, বিতর্কটা এক শতাব্দী ধরে টিকে আছে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহোৎসব বিশ্বকাপ তার জন্মলগ্ন থেকেই নানা কেলেঙ্কারি, অব্যবস্থাপনা আর বিতর্কে জর্জরিত। শুধু বিশ্বকাপই নয়, এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও বারবার জড়িয়েছে আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার নোংরা খেলায়।

স্বাগতিক দেশের কারসাজি ও মাঠের বৈষম্য: বিশ্বকাপের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামটি সময়মতো প্রস্তুতই করা যায়নি। একমাত্র আফ্রিকান দেশ হিসেবে মিশরের সেই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়ার কথা থাকলেও তারা সময়মতো জাহাজে উঠতে না পারায় উরুগুয়েতে পৌঁছাতে পারেনি। আবার প্রথম আসরে ইউরোপের দলগুলোর নামমাত্র উপস্থিতিতে উরুগুয়ে এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে, চার বছর পর ইতালিতে অনুষ্ঠিত মুসোলিনির বিশ্বকাপ তারা বয়কট করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের টুর্নামেন্টে অংশ না নেয়ার ঘটনা সেটিই প্রথম এবং একমাত্র। বিশ্বকাপের প্রথম খেলা মাঠে গড়ানোর পর থেকে স্বাগতিক দেশের পক্ষে রেফারিদের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে বারবার।

১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড যখন ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জেতে, তখন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর স্পষ্ট ধারণা ছিল পুরো আয়োজনটি ইউরোপ এবং বিশেষ করে স্বাগতিকদের জেতানোর জন্য সাজানো হয়েছিল। আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে সেবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে বিতর্কিতভাবে মাঠ থেকে বের করে দেয়া হয়। পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে উরুগুয়ের ম্যাচে দুই উরুগুইয়ান খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখান ইংরেজ রেফারি। আবার ২০০২ সালে যখন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্বকাপ যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হলো, তখন ইউরোপের দেশগুলো উল্টো ভুক্তভোগী হওয়ার অভিযোগ তোলে। দক্ষিণ কোরিয়া একে একে ইতালি ও স্পেনকে নক-আউট করে দেয়। ইতালির একটি বৈধ গোল বাতিল এবং তাদের তারকা খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেয়া নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তৎকালীন ইতালীয় মন্ত্রী ফ্রাঙ্কো ফ্রাত্তিনি বলেছিলেন, মনে হচ্ছিল তারা টেবিলে বসে আমাদের টুর্নামেন্ট থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রেখেছিল।

খেলোয়াড় আমদানি ও ‘বিষপ্রয়োগের’ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব: মাঠের বাইরে দল ভারী করার জন্য মুসোলিনিই প্রথম ভিন্ন দেশের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দ্রুত নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় দলে ভেড়ানোর কৌশল নেন। ১৯৩৪ সালের ইতালি দলের ৫ জন খেলোয়াড় এর আগে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন। এই ধারার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় যখন কাতার ২০০৬ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিনজন ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়কে রাতারাতি নাগরিকত্ব দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে ফিফা নিয়ম করতে বাধ্য হয় যে, কোনো খেলোয়াড়কে দেশের হয়ে খেলতে হলে সেই দেশের সঙ্গে তার স্পষ্ট বা বংশগত সংযোগ থাকতে হবে।

শত্রুপক্ষকে দুর্বল করার জন্য ‘বিষপ্রয়োগের’ মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগও ফুটবলে নতুন নয়। ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ববি মুরকে চুরির মিথ্যা অভিযোগে কলম্বিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়। আবার তাদের কিংবদন্তি গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কস পেটের পীড়ার কারণে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি মিস করেন, যার জন্য তিনি একটি সন্দেহজনক বিয়ারের বোতলকে দায়ী করেছিলেন। বৃটিশ সংবাদপত্র ‘অবজারভার’-এর একটি সামপ্রতিক নিবন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করা হয় যে, ব্রাজিলের তৎকালীন নড়বড়ে সামরিক একনায়কতন্ত্রকে ফুটবলীয় সাফল্যের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে সিআইএ হয়তো ব্যাঙ্কসকে বিষপ্রয়োগ করেছিল। একই রকম অভিযোগ উঠেছিল ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ব্রাজিলের হারের পর, যেখানে তাদের প্রধান তারকা রোনালদোর রহস্যময় অসুস্থতার পেছনে বিষপ্রয়োগের তত্ত্ব খতিয়ে দেখা হয়েছিল।

ফিফার আর্থিক সাম্রাজ্য ও দুর্নীতি: এই সব কনস্পিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ডালপালা মেলার প্রধান কারণ হলো, কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও অর্থের প্রবাহ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল টেলিভিশন স্ক্রিনে প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ দেখেছেন। এই তুমুল জনপ্রিয়তা থেকে ব্রডকাস্টিং রাইটস, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং লাইসেন্সিং বাবদ কোটি কোটি ডলার আয় হয়। একটি অলাভজনক সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও ফিফা এই বছর ৮.৯ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয়ের আশা করছে। এই বিশাল অর্থের বণ্টন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হওয়ায় ফিফার আওতাধীন ২১১টি জাতীয় অ্যাসোসিয়েশন এবং ৬টি আঞ্চলিক গ্রুপ প্রায়শই ফিফার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মুখ খোলে না। ২০১৫ সালে মার্কিন ও সুইস কর্তৃপক্ষের এক যৌথ তদন্তে ফিফার রুই-কাতলাদের ঘুষ নেয়ার রোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসে। ৪০ জনেরও বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

তৎকালীন দীর্ঘমেয়াদি প্রেসিডেন্ট সুইস নাগরিক সেপ ব্লাটার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি জেফরি ওয়েব একাধিক অপরাধ স্বীকার করেন। ব্লাটারের জায়গায় সংস্কারের বার্তা নিয়ে আসেন আরেক সুইস জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে কাতারকে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে দেয়ার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো ফিফাকে বরাবরই একনায়ক ও বন্ধুদের পকেট ভরার ‘অর্থ উপার্জনের মেশিন’ হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করেছে।

একনায়কদের তোষণ ও রাজনীতির সমীকরণ: ইনফান্তিনোর সংস্কার ফিফার সেই কলঙ্কিত ভাবমূর্তি খুব একটা দূর করতে পারেনি। পূর্বসূরি জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ বা সেপ ব্লাটারের মতোই ইনফান্তিনোও ক্ষমতাধর বিশ্বনেতাদের তোষামোদে পটু। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’- পদক নিয়েছেন। আবার গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে নিজেই ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ নামের একটি নতুন পুরস্কারের উদ্ভাবন করে তার হাতে তুলে দিয়েছেন।

শাসকদের প্রতি এই দাসত্বই ফিফাকে সবধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকট বা যুদ্ধের মধ্যেও নিজেদের বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য অক্ষুণ্ন রেখে নির্বিঘ্নে বিশ্বকাপ চালিয়ে যাওয়ার অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা দিয়েছে। ১৯৩৮ সালে জার্মানি যখন অস্ট্রিয়া দখল করে নিলো, ১৬ দলের টুর্নামেন্টে একটি দল কমে গেলেও ফিফা বিশ্বকাপ থামতে দেয়নি। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল ২০১৮ সালের রুশ বিশ্বকাপ আয়োজনে কোনো বাধা হতে পারেনি। আবার এই বছর একই বিশ্বকাপে ইরান ও আমেরিকার মতো যুদ্ধংদেহী দুই দেশের একই আয়োজনে যুক্ত হওয়াও প্রথম কোনো ঘটনা নয়। ১৯৮২ সালে স্পেনে যখন আর্জেন্টিনা ও বেলজিয়ামের ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হয়, তার ঠিক একদিন আগেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বৃটেনের সঙ্গে আর্জেন্টিনার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ হয়েছিল, যেখানে ইংল্যান্ড দলও অংশ নিয়েছিল।

২০২৬ সালের এই আসর থেকে বিশ্বকাপকে ৩২ দল থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দলে রূপান্তর করেছে ফিফা। এর ফলে ম্যাচের সংখ্যা ও টিকিট বিক্রি যেমন বাড়ছে, তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈষম্য, ক্ষোভ আর কেলেঙ্কারির পরিধিও। প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো মুখে যতই বলুন, আমি আশা করি এই বিশ্বকাপ বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করবে, ফুটবলপ্রেমীদের বড় অংশেরই আশঙ্কা করে নোংরা রাজনীতি আর অব্যবস্থাপনার ছড়াছড়ি হবে ত্রিদেশীয় এই আয়োজনে।

(দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে মাহবুব কাদিম)



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন