মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গত বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উভয় দেশের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এই সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দেশ দুইটির প্রতিনিধির মধ্যে শান্তি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সর্বশেষ সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, এই আলোচনা হচ্ছে না।
দেশটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আকস্মিক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা বাদ দেয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি আদৌ সম্ভব কি না।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘এই আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ বা আগে থেকে অনুমান করার মতো ছিল না।’
তবে হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়া মাত্রই জেডি ভ্যান্স ও মার্কিন প্রতিনিধিদল রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। উভয় দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে এই আলোচনা সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক নামের একটি পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে হওয়ার কথা ছিল।
তবে ঠিক কী কারণে এখন আর এই আলোচনা হচ্ছে না তা নিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু জানায়নি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
দেশ দুইটির মধ্যে হওয়া সমঝোতা চুক্তিতে বলা হয়েছে, সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ, লেবাননসহ সার্বভৌমত্বের পারস্পরিক সম্মান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা এবং ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে। শুক্রবার ইসরাইলি বাহিনীর অতর্কিত হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ইসরাইলের চারজন সেনা নিহতের খবরও পাওয়া গেছে। এনিয়ে ইসরাইলের পক্ষ থেকে পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিতের আগেই তেহরান শর্ত দিয়েছিল যে আলোচনার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে হবে।
এ ছাড়া শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। সেটাও বাতিল করা হয় এর আগে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধের দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো স্থগিত রাখা হয়েছে, সমাধান হয়নি। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, সমৃদ্ধকরণের পরিমাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠন এখন আলোচনায় তীব্র চাপের বিষয় হবে।
যদি তেহরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে এগোতে অস্বীকার করে, তাহলে শান্তি প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়তে পারে এবং যুদ্ধবিরতিও চাপের মুখে পড়বে।
এমনটি হলে ওয়াশিংটন ও ইসরাইল সেই মতকে জোরদার করবে যারা মনে করে ইরান শুধু সময় নেয়ার জন্যই এই সমঝোতা চুক্তিতে ব্যবহার করেছে এবং এতে উভয় পক্ষ আবার যুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে।
এদিকে ওয়াশিংটনে কেউ কেউ ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতা স্বারককে আগের চুক্তি– জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ), সেটির চেয়েও খারাপ বলে তুলে ধরছেন। তারা এই যুক্তি দেন যে, ট্রাম্প এমন একটি কাঠামো মেনে নিয়েছেন যা কঠিন পারমাণবিক প্রশ্নগুলো স্থগিত রেখে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে।
এ ছাড়া এই সমঝোতা চুক্তি নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের কিছু অংশসহ, ইতিমধ্যেই অনেকে অভিযোগ তুলেছেন যে ট্রাম্প অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল থেকে ইরানের উপকার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি।
যদিও ট্রাম্প ও প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা বলেছেন, এই অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে না, তবুও দলটির ভেতরে অস্বস্তি রয়েছে।
এনিয়ে টেক্সাসের সেনেটর টেড ক্রুজ বলেন, ইতিহাস আমাদের শেখায়, যারা আমাদের হত্যা করতে চায়, এমন ধর্মতান্ত্রিক উন্মাদদের বিলিয়ন ডলার দেওয়া ভালো ধারণা নয়। আমার মনে হয় প্রেসিডেন্ট খুব খারাপ পরামর্শ পাচ্ছেন।
এ ছাড়া রক্ষণশীল বিশ্লেষক টাকার কার্লসন আরও সরাসরি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ অপমানজনক পরাজয়। এটি একটি পরাজয়।
