শোক ও সংগ্রাম পেরিয়ে আলোকিত ডেভিড

শোক ও সংগ্রাম পেরিয়ে আলোকিত ডেভিড

ফন্ট সাইজ:

ঘরের মাঠে ১৯৮৬ সালে ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় কানাডার। এরপর তিন যুগ বিশ্বকাপে খেলা হয়নি। কাতার বিশ্বকাপে ফেরা হলেও গ্রুপপর্বের গণ্ডি পেরুতে পারেনি ম্যাপল পাতার দেশটি। বিশ্বকাপে প্রথম জয় পেতে কানাডাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে চার দশক। অষ্টম ম্যাচে এসে বিশ্বকাপে প্রথম জয়ের দেখা পেলো কানাডা। সেই জয়ের রূপকার জোনাথন ডেভিড। যার ব্যক্তিজীবনটাও আবেগী গল্পের। এবারের বিশ্বকাপের দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক করে কানাডাকে এনে দিয়েছেন ইতিহাসগড়া জয়।

২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে জন্ম নেন ডেভিড। শিকড় হাইতিতে। জন্মের মাত্র তিন মাস পরই হাইতিয়ান বাবা-মায়ের সঙ্গে দেশে ফিরে যান তিনি। সেখানে চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই ফুটবলের প্রতি ডেভিডের ভালোবাসা তৈরি হয়। ছয় বছর বয়সে উন্নত জীবনের আশায় পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান কানাডার অটোয়ায়। কানাডায় প্রথমদিকে আমেরিকান ফুটবল খেলতেন। দশ বছর বয়সে তার বাবা স্থানীয় একটি ফুটবল ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেন। সে সময় কানাডায় ইউরোপ বা লাতিন আমেরিকার মতো উন্নত ফুটবল একাডেমি ছিল না। অটোয়ার কনকনে শীতে বছরের অনেকটা সময় মাঠ বরফে ঢাকা থাকতো। ইনডোর সুবিধাও ছিল স্বল্প। এই সংগ্রামের মধ্যেই অনূর্ধ্ব-১৪ ও অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায়ে অন্টারিও যুব লীগে ৪১ ম্যাচে ৭০ গোল করে হইচই ফেলে দেন। স্বপ্ন ছিল ইউরোপে খেলার। কোচের তৈরি হাইলাইট ভিডিও নিয়ে ট্রায়াল দিতে যান অস্ট্রিয়ার সালজবুর্গ ও জার্মানির স্টুটগার্টে। কিন্তু যথেষ্ট দক্ষ নন জানিয়ে দুই ক্লাবই তাকে ফিরিয়ে দেয়। এই প্রত্যাখ্যান ডেভিডের মনে দাগ কাটে। হাল না ছেড়ে কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের ক্লাব গেন্ট ডেভিডের সঙ্গে চুক্তি করে। ইউরোপে পা রাখার দুই বছরের মাথায় তার জীবনে নেমে আসে দুঃখের ছায়া। ক্যান্সারে মারা যান তার মা রোজ। পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে একা থাকা অবস্থায় এই শোক তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। কিন্তু সেই কষ্টকেই শক্তিতে পরিণত করেন ডেভিড।

বেলজিয়াম লীগে গোলবন্যা বইয়ে দেন। ২০২০ সালে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন ফ্রান্সের লিল ক্লাবে। পিএসজিকে টপকে এনে দেন লীগ ওয়ান শিরোপা। ২০২৫ সালে পাড়ি জমান ইতালির জুভেন্টাসে। কানাডার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। তিনবার নির্বাচিত হন কানাডা সকার প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার। ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে কাতারের বিপক্ষে শুরু থেকেই আধিপত্য ছিল কানাডার। ১৬ মিনিটে কাইল লারিনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ২৯ মিনিটে প্রথমবার জালে বল পাঠান ডেভিড। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে পান নিজের দ্বিতীয় গোল। বিরতির আগেই ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় কানাডা। দ্বিতীয়ার্ধে নাটকীয়তা বাড়ে। কাতারের দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইেট প্রথম এশিয়ান দল হিসেবে এক ম্যাচে দুই লাল কার্ড।

চলতি বিশ্বকাপে ৬টি লাল কার্ড দেখালেন রেফারিরা। ২০১৪ সালের (১০টি লাল কার্ড) পর বিশ্বকাপের কোনো আসরে সর্বোচ্চ। ম্যাচের যোগ করা সময়ে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ডেভিড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বাগতিক দেশের হয়ে হ্যাটট্রিক করা ষষ্ঠ ফুটবলার তিনি। সবশেষ এমন কীর্তি দেখা গিয়েছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপে। ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি জিওফ হার্স্ট ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেন। এছাড়া কনকাকাফ অঞ্চলের দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব দেখালেন ডেভিড। তার আগে ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনাউড এই কীর্তি গড়েছিলেন। ১৯৮২ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ইতালির পাওলো রসির পর জোনাথন ডেভিডই প্রথম জুভেন্টাস খেলোয়াড়
হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে হ্যাটট্রিক করলেন। বিশ্বকাপে কোনো কনকাকাফভুক্ত দেশের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ৬ গোল করার রেকর্ড এটি। এর আগে ১৯৭০ সালে এল সালভাদরের বিপক্ষে মেক্সিকো এবং ২০২৬ সালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ৪টি করে গোল করেছিল।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন