সুইস ব্যাংকের অন্ধকার গহ্বরে দক্ষিণ এশিয়ার লুটেরা অর্থনীতি

সুইস ব্যাংকের অন্ধকার গহ্বরে দক্ষিণ এশিয়ার লুটেরা অর্থনীতি

ফন্ট সাইজ:

সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল ব্যাংকের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে বাংলাদেশের সচেতন মহলে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা নিছক সংখ্যার বিতর্ক নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন, একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ৬৩ হাজার সুইস ফ্রাঁ, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। মাত্র এক বছরে এই বৃদ্ধির হার সাড়ে ৪১ শতাংশ। এই সংখ্যা পড়ে যখন একজন সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক ভাবেন, তখন তার মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে এই অর্থ কার, এবং এই অর্থ কীভাবে সেখানে গেল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল সুইজারল্যান্ডের দিকে তাকালে চলবে না, তাকাতে হবে বাংলাদেশের ভেতরের সেই কাঠামোর দিকে, যে কাঠামো দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্রের সম্পদকে ব্যক্তির পকেটে, এবং সেই পকেট থেকে বিদেশের তিজোরিতে পাঠানোর সুযোগ করে দিয়েছে। অর্থপাচার কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, যেখানে রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে।

পরিসংখ্যানের ভেতরে যদি গভীরভাবে প্রবেশ করা যায়, তাহলে একটি চমকপ্রদ প্যাটার্ন চোখে পড়ে। ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল সর্বোচ্চ ৮৭ কোটি ফ্রাঁ। ২০২২ সালে তা নেমে আসে ৫ কোটি ৫২ লাখে, ২০২৩ সালে প্রায় তলানিতে ঠেকে মাত্র ১ কোটি ৭৭ লাখে। তারপর ২০২৪ সালে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে ৫৮ কোটিতে এবং ২০২৫ সালে আরও বেড়ে ৮৩ কোটি ছাড়িয়ে যায়। এই ওঠানামার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক, তা কোনো বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অর্থের গতিপথও পরিবর্তিত হয়। নতুন মুখ ক্ষমতায় এলে পুরনো লুটেরারা অর্থ সরিয়ে নেয়, নতুন লুটেরারা নতুন পথে অর্থ পাঠাতে শুরু করে। এই চক্রটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি ভয়াবহ বাস্তবতা।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি, তা হলো সুইস ব্যাংকের পরিসংখ্যান আসলে প্রকৃত চিত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক নিজেই স্বীকার করে যে, কোনো বাংলাদেশি যদি অন্য দেশের নাগরিকত্ব ব্যবহার করে বা নিজের পরিচয় গোপন রেখে অর্থ জমা করেন, তাহলে সেই অর্থ এই পরিসংখ্যানে আসে না। একইভাবে স্বর্ণ বা অন্যান্য মূল্যবান সম্পদও এই হিসাবের বাইরে। এর মানে দাঁড়ায়, প্রকৃত পাচারের পরিমাণ এই সংখ্যার চেয়ে বহুগুণ বেশি। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যায় বিভিন্ন পথে। সুইজারল্যান্ড সেই পাচারের কেবল একটি গন্তব্য, বাকি অর্থ ছড়িয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে।

দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আরও জটিল এবং আরও বেদনাদায়ক। ভারতে ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে আমানত সামান্য কমে ৩২৩ কোটি ফ্রাঁতে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৩৫০ কোটি। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ২৩ কোটি ফ্রাঁর বেশি অর্থ এখনো সুইস তিজোরিতে। তিনটি দেশ মিলিয়ে কেবল সুইজারল্যান্ডেই গচ্ছিত রয়েছে প্রায় ৪৩০ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এই তিনটি দেশেরই কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যে জীবন কাটাচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার গর্ব করলেও দেশটিতে এখনো বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক দরিদ্র মানুষের বাস। পাকিস্তান আইএমএফের কাছে বারবার ঋণের ভিক্ষা করছে। বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ এই তিন দেশের ধনী ও ক্ষমতাবান শ্রেণির অর্থ নিরাপদে ঘুমাচ্ছে সুইস আল্পসের ছায়ায়।

এই প্রসঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো, একদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সুশাসন, দুর্নীতি দমন এবং আর্থিক স্বচ্ছতার পাঠ দেয়, অন্যদিকে সেই একই দেশগুলো থেকে পাচার হওয়া কালো অর্থ তাদের নিজেদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাদরে গ্রহণ করে। এই দ্বিচারিতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি সুচিন্তিত ব্যবস্থা। উন্নত বিশ্বের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দরিদ্র দেশের পাচার হওয়া অর্থ থেকে সুদ, ফি এবং বিনিয়োগের সুবিধা নেয়, আর সেই দরিদ্র দেশগুলো একই সময়ে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কঠোর শর্ত মেনে চলতে বাধ্য হয়। এই পরিহাসের চেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস আধুনিক বিশ্বে আর কমই আছে।

অর্থপাচারের পথগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হয় না। হুন্ডি, ট্রেড ইনভয়েস ম্যানিপুলেশন, শেল কোম্পানি, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি এই সব পথে প্রতিনিয়ত বিপুল অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে ব্যবহার করে অর্থপাচার বাংলাদেশে একটি পরিচিত প্রবণতা। একটি পণ্য আমদানিতে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দেখিয়ে বাড়তি অর্থ বিদেশে রেখে দেওয়া, অথবা রপ্তানিতে কম মূল্য দেখিয়ে বাকি অর্থ বিদেশেই স্থানান্তর করা এই পদ্ধতিগুলো এত সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হয় যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রায়ই ধরতে পারে না। আর যখন ধরতে পারে, তখনও রাজনৈতিক সংযোগের কারণে বিচার হয় না।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, তার সামনে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছিল। কিন্তু এই কাজ কেবল ঘোষণা দিয়ে হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সুইজারল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় তথ্য বিনিময় চুক্তি, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি বা এমএলএটির সক্রিয় ব্যবহার, এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন। কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করে বা বিবৃতি দিয়ে এই অর্থ ফেরত আসবে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার সমন্বয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দূতাবাসের অবস্থান এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কতটা আন্তরিক ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে তা স্পষ্ট নয়। দূতাবাস কর্মী তথা পুরো সিস্টেম কে জবাবদিহিতার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরী এখন ।

এখানে একটি তিক্ত সত্য উচ্চারণ করা প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। কারণ যারা এই অর্থ পাচার করেছে, তারা প্রায়ই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে এবং ক্ষমতার পালাবদলের পরও তাদের একটি অংশ নতুন কাঠামোর সঙ্গে মিলে যায়। পাচারকারীর বিচার করতে গেলে অনেক সময় নিজেদের দলের লোককেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়, এই রাজনৈতিক সাহস খুব কম সরকারই দেখাতে পেরেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উচিত এই বিষয়ে একটি আঞ্চলিক ঐকমত্য গড়ে তোলা। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যদি একত্রে সুইজারল্যান্ড এবং অন্যান্য ট্যাক্স হেভেন দেশগুলোর উপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সার্কের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে একটি সম্মিলিত আর্থিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই তিন দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার যে ঘাটতি, তা এই উদ্যোগকে কঠিন করে তোলে।

শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্নে এসে ঠেকে। যে অর্থ সুইস ব্যাংকের তিজোরিতে নিরাপদে ঘুমাচ্ছে, সেই অর্থ বাংলাদেশের কোনো গার্মেন্টকর্মীর অবৈতনিক মজুরি থেকে এসেছে কি না, কোনো কৃষকের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বেদনা থেকে এসেছে কি না, কোনো সরকারি প্রকল্পের কমিশনের টাকা থেকে এসেছে কি না এই প্রশ্নের উত্তর আমরা হয়তো কখনো পুরোপুরি জানতে পারব না। কিন্তু এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই অর্থের প্রতিটি ফ্রাঁর পেছনে রয়েছে একটি দেশের মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস।

সুইস ব্যাংকের পরিসংখ্যান কেবল একটি অর্থনৈতিক তথ্য নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অভিযোগনামা। এই অভিযোগনামার বিচার না হলে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না, দক্ষিণ এশিয়া তার বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে না। লুটেরাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা তাই কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি জাতির আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন