নিরাপত্তার ঘেরাটোপ যাতে সরকার প্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয় সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য এসএসএফ’র প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা হলে
স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স-এসএসএফ’র ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। আলোচনা অনুষ্ঠানের আগে এসএসএফ’র নবনির্মিত অত্যাধুনিক ফায়ারিং রেঞ্জ উদ্বোধন এবং উদ্বোধনী মহড়া দেখেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসএসএফ’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এইদিনে আমি আমার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। সেটি হলো- সরকারপ্রধান হিসেবে জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার উপরই আমার সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা। সুতরাং নিরাপত্তার ঘেরাটোপ যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, একটি সফিস্টিকেটেড বাহিনী হিসেবে সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাই।
তিনি আরও বলেন, আরও একটি বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, অবশ্যই আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেবেন। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জনগণ যাতে দুর্ব্যবহারের শিকার না হয় সেদিকেও বিশেষভাবে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আপনারা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন- এই প্রত্যাশা রাখছি।
তারেক রহমান বলেন, এসএসএফ’র মতো বিশেষায়িত বাহিনীর জন্য আধুনিক নিরাপত্তা কৌশল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্যের সাহস-সততা-বিশ্বস্ততা-সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব-নিয়মানুবর্তিতা এবং সর্বোপরি ‘চেইন অফ কমান্ড’ এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং দেশে-বিদেশে রাষ্ট্রঘোষিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। সুতরাং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে দেশের অন্য সকল নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই এসএসএফ-কে নিরাপত্তা কৌশল নিশ্চিত করতে হয়। আমি মনে করি, সমন্বয় যত বেশি দক্ষতার সঙ্গে করা যায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ততবেশি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
সরকারপ্রধান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন মেয়াদে সরকারপ্রধান থাকাকালে এবং সর্বশেষ জীবনের শেষদিনগুলোতে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় এসএসএফ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম নামাজে জানাজা আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে এসএসএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমি এসএসএফ-কে ‘‘আমার ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই’’।
তিনি আরও বলেন, সরকারপ্রধান হিসেবে বর্তমানে প্রতিদিন-প্রতি সময় আমি এসএসএফ’র কার্যক্রম সরাসরি প্রত্যক্ষ করছি। তবে এসএসএফ’র কার্যক্রমের সঙ্গে আমার পরিচয় নতুন নয়। মরহুমা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তখন থেকেই অর্থাৎ আমার তরুণ বেলা থেকেই আমি এসএসএফ’র কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসএসএফ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের অনেক পার্থক্য। বর্তমানে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা-ব্যবস্থা, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকাশের ফলে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদেরকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা জরুরি। একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে সাহস, দক্ষতা, কৌশল এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে এসএসএফ’র পিছিয়ে থাকার কোনোই সুযোগ নেই।
১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পরে এসএসএফ’র দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিএনপি জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার পর ১৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী সরকারপ্রধান হিসেবে এসএসএফ সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আপনারা জানেন, জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করে সড়কে যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আমি আমার গাড়িবহরের আকার সীমিত করেছি। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে এসএসএফকে হয়তো দক্ষতা এবং নিরাপত্তা কৌশলের উপর বেশি জোর দিতে হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, আপনারা যথাসম্ভব সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায়শই জনসভা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। এই ধরনের অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিছুটা জটিল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে একদিকে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা অপরদিকে নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত রাখা- এই দু’টির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এসএসএফ-কে তাদের নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হয়। আমি মনে করি, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু এবং সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এসএসএফ’র কর্মদক্ষতাও বিকশিত হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, পেশাগত কর্মদক্ষতা বাড়াতে নবনির্মিত এই ফায়ারিং রেঞ্জ নিঃসন্দেহে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। আমি আশা করি, নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন এবং নিজেদের পেশাগত কর্মদক্ষতা বাড়াতে আপনারা এই ফায়ারিং রেঞ্জের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবেন। ২০০২ সালের পর এসএসএফ’র ’রেড বুক’ সময়ের চাহিদানুযায়ী পুনরায় সংস্কার করে বর্তমানে আরও আধুনিক এবং সময়োপযোগী করা হয়েছে। এই ‘রেড বুক’ এসএসএফ’র কার্যপদ্ধতি এবং কর্মপদ্ধতির নীতিমালা প্রদানের পাশাপাশি আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছে। আপনাদের জন্য ‘রেড বুকে’ উল্লিখিত নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে অনুসরণ অবশ্য জরুরি। তবে ‘ রেড বুকে’র নির্দেশনার পাশাপাশি সময় এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নেরও সুযোগ রয়েছে। এসএসএফ’র মতো বিশেষায়িত বাহিনীর জন্য আধুনিক নিরাপত্তা কৌশল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্যের সাহস-সততা-বিশ্বস্ততা-সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব-নিয়মানুবর্তিতা এবং সর্বোপরি ‘চেইন অফ কমান্ড’ এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং দেশে-বিদেশে, রাষ্ট্রঘোষিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। সুতরাং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে দেশের অন্য সকল নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই এসএসএফ-কে নিরাপত্তা কৌশল নিশ্চিত করতে হয়। আমি মনে করি, সমন্বয় যত বেশি দক্ষতার সঙ্গে করা যায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ততবেশি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশের সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের বাছাই করেই এসএসএফ গঠন করা হয়। এরপর আপনাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার উপর আপনাদেরকে দেশে-বিদেশে উন্নত মানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএসএফ-কে আরও কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে ইনশাআল্লাহ।
এসএসএফ’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুস সামাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলাম, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
