ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি

সাড়ে ১৩ মাস গুম রেখে নির্যাতনের পর ‘জঙ্গি নাটকে’ গ্রেপ্তার দেখানো হয়

ফন্ট সাইজ:

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কর্মী ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বাসিন্দা মো. তাজুল ইসলাম সুমন দাবি করেছেন, ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাকে অপহরণ করে দীর্ঘ সাড়ে ১৩ মাস গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে উপস্থাপন করে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আট বছরের কারাভোগের পর ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জেআইসি এর মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দিতে তিনি এসব অভিযোগ করেন। মামলাটির পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২৩ জুলাই।
জবানবন্দিতে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি একসময় মানিকগঞ্জের দারুল উলুম মানিকগঞ্জ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন ও ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর অভিযানের সমালোচনা করতেন।’

তার দাবি, ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর রাতে দুজন ব্যক্তি মাদ্রাসার মাঠে ডেকে নিলে ১০ থেকে ১৫ জন লোক দেয়াল টপকে প্রবেশ করে তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এরপর চোখ বেঁধে একটি অজ্ঞাত স্থানে নেয়া হয়, যেখানে তার ফেসবুক ও জি-মেইলের পাসওয়ার্ড চাওয়া হয় এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়ে মারধর করা হয়।
জবানবন্দি অনুযায়ী, প্রথমে তাকে একটি কক্ষে প্রায় সাড়ে সাত মাস আটক রাখা হয়। সেখানে নিয়মিত জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হতো। তিনি জানান, কক্ষে অবস্থানকালে কাফরুল এলাকার মসজিদের মাইকের আওয়াজ শুনতে পেতেন এবং বিমান ওঠানামার শব্দও শুনতেন। এ থেকে তার ধারণা, বন্দিশালাটি ঢাকার কাফরুল এলাকার আশপাশে ছিল। পরে তাকে আরও কয়েকটি ভিন্ন স্থানে স্থানান্তর করা হয়। একপর্যায়ে তাকে ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, একবার তাকে গাড়িতে তোলার আগে কয়েকজন কর্মকর্তার কথোপকথনে ‘সিএফ’ শব্দ শুনতে পান, যা পরে তিনি ‘ক্রসফায়ার’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ বলে জানতে পারেন।
তাজুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে তাকে এমন একটি স্থানে রাখা হয় যেখানে ‘র‍্যাব-৪’ লেখা স্ট্যান্ড ফ্যান ও র‍্যাবের গাড়ি দেখতে পান। পরে তাকে ‘র‍্যাব-১০’ হিসেবে পরিচিত আরেকটি স্থাপনাতেও রাখা হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর তাকে এবং আরও কয়েকজনকে চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানাধীন কর্নেলহাট এলাকায় নিয়ে গিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের একটি সাজানো ঘটনা তৈরি করা হয়। এরপর সাংবাদিকদের সামনে তাদের জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং পরে র‍্যাব-৭ এর মাধ্যমে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।

জবানবন্দি অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও অস্ত্র আইনে মোট তিনটি মামলা করা হয়। আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর পর বিভিন্ন দফায় পুলিশ ও র‍্যাবের হেফাজতে রিমান্ডে নেয়া হয়।
তাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, র‍্যাবের হেফাজতে থাকা অবস্থায় এক কর্মকর্তা তাকে জানান যে, তাকে ডিজিএফআই তুলে এনেছিল। তার দাবি, পুরো ঘটনাটি ছিল একটি ‘জঙ্গি নাটক’, যা তৎকালীন নিরাপত্তা সংস্থার কিছু কর্মকর্তা পরিকল্পিতভাবে সাজিয়েছিলেন।

জবানবন্দিতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা এবং তৎকালীন ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করে বিচার করার দাবি জানান।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন