চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু

চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু

ফন্ট সাইজ:

৩৬ বছরের অপেক্ষা, আক্ষেপ। কতো কান্না। কতো ব্যর্থতা। সবকিছুর অবসান হয়েছিল এক রাতে। মরুর বুকে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন লিওনেল মেসি। আকাশভরা আলো। লুসাইলের গ্যালারিভরা উচ্ছ্বাস। পৃথিবী যেন থমকে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। সেই রাতেই অমর হয়ে গিয়েছিলেন মেসি। তারপর চার বছর কেটে গেছে। লুসাইল এখন স্মৃতি। সামনে নতুন মঞ্চ। নতুন শহর। নতুন গল্প। কানসাস সিটির মাঠে আগামীকাল সকাল ৭টায় আলজেরিয়ার মুখোমুখি হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কাগজে-কলমে এটি একটি ম্যাচ। কিন্তু অনুভূতিতে এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু। কারণ, এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে হাঁটছেন তিনি। আকাশি-সাদা জার্সিতে বয়ে বেড়াচ্ছেন কোটি মানুষের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নে বাগড়া দিতে প্রস্তুত ১২ বছর পর ফেরা আলজেরিয়া। তারাও যে রিয়াদ মাহরেজের বিদায় রাঙাতে চায়। ৩৫ বছর বয়সী মাহরেজ ক্লাব পর্যায়ে বেশ কয়েকবার মেসির মুখোমুখি হয়েছেন। তবে জাতীয় দলে এটাই তাদের প্রথম এবং সম্ভবত শেষ দেখা হতে চলেছে।

শিরোপা জয়ের পর অনেক দলেরই পারফরম্যান্সে ভাটা পড়ে। কোচ লিওনেল স্কালোনির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, তিনি ট্রানজিশন পিরিয়ড দ্রুত সামলে নিয়েছেন। আর্জেন্টিনাকে মেসিনির্ভরতা থেকে দলনির্ভরতায় রূপ দিয়েছেন। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে স্কোয়াড, যেখানে মেসি কেন্দ্রবিন্দু হলেও পুরো গল্পটা আর শুধু তাকে ঘিরে নয়। এজন্যই হয়তো বিশ্বকাপের পর কোপা আমেরিকা ট্রফিটাও সহজে জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। কোপা আর বিশ্বকাপ যদিও এক নয়। এখানে ছোট দলগুলোও প্রাণপণ লড়ে। একটু হের ফের হলে পা হড়কানোর সমূহ সম্ভাবনা। গত আসরেই যেমন মেসিদের স্বপ্নে ধাক্কা দিয়েছিল সৌদি আরব। আলজেরিয়াও সহজ হবে না। বিশ্বকাপে মোট পাঁচবার অংশ নেয়া আফ্রিকান দলটির সেরা সাফল্য ২০১৪তে দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলা। ৮২’র আসরে শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তারা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা খেলেছে মোটে এক ম্যাচ। ২০০৭ সালের ওই ম্যাচে মেসির জোড়া গোলে আলবিসেলেস্তেরা জেতে ৪-৩ ব্যবধানে।

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের ২৮ নম্বর দল আলজেরিয়া নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জ জানাবে। কিন্তু অনেকটাই নির্ভার শীর্ষ দল আর্জেন্টিনা। সব পাওয়া হয়ে গেলে বুঝি এমন অনুভূতিই জাগে! তবে কি নির্ভার আর্জেন্টিনার ট্রফি ধরে রাখার কোনো তাড়না নেই? আছে। নির্ভার মানে নির্লিপ্ততা নয়। ২০২২ সালে তাদের চোখে ছিল অপূর্ণতার ক্ষুধা। এখন তারা মাঠে নামবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মর্যাদা রক্ষায়। আর কোচ লিওনেল স্কালোনিও যেন মেসিকে বলার চেষ্টা করছেন, ‘তোমার ট্রফি তো মাত্র চারটি!’

মেসির কাঁধের ভার এরই মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন হুলিয়ান আলভারেজ-লাওতারো মার্টিনেজরা। তাদের সঙ্গে তরুণ থিয়াগো আলমাদা, জুলিয়ানো সিমিওনে, নিকো পাজ, হোসে লোপেজরা কামান দাগাতে তৈরি। মাঝমাঠে গত আসরের পরীক্ষিত সৈনিক এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পল, লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে ভ্যালেন্টিন বার্কো, জিওভানি লো সেলসো, এসিকুয়েল পালাসিওস আর নিকো গঞ্জালেস। রক্ষণেও যথারীতি অভিজ্ঞ নিকোলাস তালিয়াফিকো, গঞ্জালোস মন্তিয়েল, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওটামেন্ডির সঙ্গে ফাকুন্দো মেদিনা, নাহুয়েল মলিনা। ইনজুরিতে ছিটকে যাওয়া লিওনার্দো বালের্দির জায়গায় এসেছেন মার্কোস সেনসি। গোলমুখের বাজপাখি এমি মার্টিনেজের সঙ্গে ব্যাকআপ হিসেবে থাকা হুয়ান মুসো আর জেরোনিমো রুলিও রয়েছেন ছন্দে। সবমিলিয়ে একাদশ সাজাতে মধুর সমস্যাতেই পড়বেন স্কালোনি।

সম্ভাব্য একাদশ
নির্ভরযোগ্য সাংবাদিক গাস্তুল এদুলের বরাত দিয়ে মুন্দো আলবিসেলেস্তে জানাচ্ছে, আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঝমাঠে ডি পল, আলমাদা, এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টারকে শুরুর একাদশে রাখতে পারেন স্কালোনি। চোট কাটিয়ে পোস্টের নিচে ফিরছেন মার্টিনেজও। তবে এখনো পুরোপুরি ফিট নন তালিয়াফিকো। লেফটব্যাক পজিশনে তার জায়াগা নিতে পারেন মেদিনা। রাইটব্যাকে মলিনা ও সেন্টারব্যাক হিসেবে রোমেরোর সঙ্গে লিসান্দ্রো। আক্রমণভাগে মেসির সঙ্গে মার্টিনেজ বা আলভারেজ। আলমাদা অতিরিক্ত মিডফিল্ডার হিসেবে না থাকলে তারা দুজনই সুযোগ পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য ফরমেশন ৪-৩-৩। আর আলমাদাকে অ্যাটাকিং মিডে রেখে সম্ভাব্য ফরমেশন হতে পারে ৪-২-৩-১।

মাইলফলকের মুহূর্ত
ফুটবল সবসময়ই গোল আর ট্রফির গল্প নয়। কখনো কখনো ফুটবল একজন মানুষের গল্প। একটি স্বপ্নের গল্প। একটি অসম্ভব যাত্রার গল্প। রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি দেখতে দেখতে ১৯৯ ম্যাচের গল্প তৈরি করে ফেললো। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হতে যাচ্ছে ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাইলফলক। গ্যালারিতে বসে থাকা মানুষগুলো জানে, তারা শুধু একটি ম্যাচ দেখবে না। তারা দেখবে একটি যুগকে। একজন কিংবদন্তিকে। ১৯৯ ম্যাচে মেসি জালের দিশা পেয়েছেন ১১৭ বার। গোলে সহায়তা ৬৪ বার। বিশ্বকাপ ফাইনালসহ অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচে হেসেছে তার পা। কানসাস সিটিতে কি আরও একবার হাসবেন মেসি? দেখার অপেক্ষায় কোটি ভক্ত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন