ইয়াসিন আয়ারির গোল উৎসব ও এক নীরব উপাখ্যান

ইয়াসিন আয়ারির গোল উৎসব ও এক নীরব উপাখ্যান

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক ম্যাচ, আর তাতেই কি না জোড়া গোল! ২২ বছরের ইয়াসিন আয়ারির জন্য মন্টেরির এস্তাদিও স্টেডিয়ামে রাতটি হতে পারতো বাঁধভাঙা উল্লাসের। ম্যাচের ঠিক সপ্তম মিনিটে যখন সুইডেনের এই উইঙ্গার তিউনিসিয়ার জালে দৃষ্টিনন্দন এক ভলিতে বল জড়ালেন, গ্যালারি তখন নীল-হলুদ উন্মাদনায় মাতোয়ারা। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাঠের সবুজ ঘাসে এক অদ্ভুত নীরবতা ভাঙলেন আয়ারি। দুই হাত তুলে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গির পর পরম শ্রদ্ধায় মাথা কুর্নিশ করে লুটিয়ে পড়লেন সিজদায়। এই নীরবতার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন-রক্তের টান বনাম নাড়ির বন্ধন।

সুইডেনের জার্সি গায়ে খেললেও আয়ারির ধমনিতে বইছে উত্তর আফ্রিকান রক্ত। তার পিতা তিউনিসিয়ান, আর মা মরক্কোর বাসিন্দা। আয়ারির জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনে। ২০২১ সালেও তিউনিসিয়া ফুটবল ফেডারেশন তাকে দলে ভেড়াতে মরিয়া চেষ্টা চালায়। তবে ইয়াসিন বেছে নেন তার জন্মভূমিকেই। তার বাবা আজুজ আয়ারির প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল তাতে। সুইডিশ সংবাদপত্র আফটনব্লাডেটকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আজুজ বলেছিলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম সে সুইডেনের হয়েই খেলুক। যে দেশ তাকে বড় করেছে, তাকে আগলে রেখেছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটাই ছেলের প্রথম কর্তব্য ছিল।’

বাবার এই সিদ্ধান্তকে ‘স্বাভাবিক’ বলেই মেনে নেন আয়ারি। তবে গত ডিসেম্বরের ড্র যখন তিউনিসিয়া ও সুইডেনকে একই গ্রুপে ফেলে, তখন নিয়তির এই পরিহাসে চমকে ওঠেন ইয়াসিন নিজেও। ম্যাচ শুরুর আগে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষ হিসেবে তিউনিসিয়াকে পাওয়াটা ছিল এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য সংযোগ।

তিউনিসিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে ৫-১ গোলের এক মহাকাব্যিক জয় দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে সুইডেন। মন্টেরির ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর গুমোট গরমে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে সুইডেন। সপ্তম মিনিটে ভিক্টর লিন্ডেলফের উঁচু করে বাড়ানো বল ঠিকঠাক ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হন তিউনিসিয়ান গোলকিপার আব্দুলমোহিব চামাখ। ভিক্টর ইয়োকেরেসের ফিরতি শট প্রতিহত হলেও, আলগা বল বাতাসে ভাসিয়ে জালে জড়ান ইয়াসিন আয়ারি। এরপর একে একে জাল খুঁজে নেন আলেক্সান্দার ইসাক, ভিক্টর ইয়োকেরেস ও মাতিয়াস সভানবার্গ।

বিবিসি বলছে, মাঠে নামার মাত্র দ্বাদশ সেকেন্ডে করা সভানবার্গের গোলটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে বদলি হিসেবে দ্রুততম। আবার ফুটবলের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান অপটার মতে, সভানবার্গ গোল করেন মাঠে ঢোকার অষ্টাদশ সেকেন্ডে, যা দ্বিতীয় দ্রুততম। ২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগালের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে ষোড়শ সেকেন্ডে গোল করেন উরুগুয়ের রিচার্ড মোরালেস। ম্যাচের একেবারে অন্তিমলগ্নে, ৯৫তম মিনিটে তিউনিসিয়ান বক্সের সীমানা থেকে বুলেট গতির শটে নিজের দ্বিতীয় ও দলের শেষ গোলটি করেন আয়ারি।

ম্যাচ শেষে বিধ্বস্ত তিউনিসিয়া বস সাব্রি লামুশি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা আজ ব্যক্তিগত পর্যায়ে অসংখ্য ভুল করেছি। আর এই স্তরের ফুটবলে এত ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।’ বিপরীতে, ডাগআউটে তৃপ্তির হাসি হাসলেও মাটিতেই পা রাখছেন সুইডেন কোচ গ্রাহাম পটার। তিনি বলেন, ‘চমৎকার রাত, দুর্দান্ত শুরু। এটি মূলত একটি নিখুঁত দলীয় পারফরম্যান্স ছিল, যার সুবাদে ইসাক এবং ভিক্টর তাদের স্বাভাবিক খেলাটা উপহার দিতে পেরেছে।’

ম্যাচের সপ্তম মিনিটে যে আয়ারিকে আবেগের এক সংযত রূপে দেখ যায়, ঠিক ৯৫তম মিনিটে পঞ্চম গোলের পর তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তিউনিসিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর উত্তরসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই সুইডিশ গ্যালারির করতালিতে নিজেকে সমর্পণ করেন তিনি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন