সারা দেশ জেগে উঠেছে দাবি করে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তরুণ যুবকরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানিয়ে দিয়েছে। পুরনো বন্দোবস্তের সঙ্গে তারা নেই। বস্তাপচা রাজনীতি আর ফিরিয়ে আনতে চায় না তারা। নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়। তিনি বলেন, জনগণ আগামী ১২ তারিখ সেই রায় দেবে। দুর্নীতিবাজদের, চাঁদাবাজদের লাল কার্ড দেখাবে। আধিপত্যবাদের গোলামদের লাল কার্ড দেখাবে।
গতকাল রাজধানীর মেরুল বাড্ডার ডিআইটি মাঠে ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমীর এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, হাদি আমরা তোমাদের কাছে এবং তোমাদের বন্ধুদের কাছে বড়ই ঋণী। কথা দিচ্ছি তোমাদের আকাক্সক্ষার নতুন বাংলাদেশ হলে, দেশ এবং জনগণের সেবা করার সুযোগ পেলে তোমরা যেমনটা চেয়েছিলে তেমনটাই যোগ্য এবং দৃপ্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, এই বাংলাদেশ আমরা যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। আমরা যুবকদের হাতে বাংলাদেশের দায়িত্ব দিতে চাই। ’২৪-এর যুবকেরা কোথাও বেকার ভাতা চায় নাই, বেকার ভাতার জন্য স্লোগানও দেয়নি। সেদিন যুবকেরা বলেছিল আমাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দাও, আমাদের কাজ দাও। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ’৭১ দেখেছি আর ’২৪ আমরা পেয়েছি। ’৪৭-এ যে আকাক্সক্ষা ছিল হুবহু ’৭১ সালেও সেই আকাক্সক্ষা ছিল। ’২৪-এ সেই আকাক্সক্ষার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ’৪৭-এর পরে ২৩ বছর আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। ’৭১-এর পরে ৫২ বছর সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। এখন ৫৪ বছর অতিক্রম হয়ে গেছে। চব্বিশে আমাদের যুবক ও ছাত্রসমাজ বিশাল কোনো দাবি নিয়ে আসেনি। তাদের একটি ন্যায্য ও সাধারণ দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। সেটা হলো কোটা সংস্কারের আন্দোলন। কিন্তু অতীতের মতো ফ্যাসিবাদী কায়দায় যুব ও ছাত্রসমাজকে দমানোর চেষ্টা করেছিল।
তিনি বলেন, আপনাদের স্মরণ থাকার কথা ১৫ তারিখ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কলিজার টুকরা মেয়েদের গায়ে যখন হাত তুলেছিল সারা বাংলাদেশের মানুষ তখন জ্বলে উঠেছিল। তার পরের দিন ১৬ তারিখ উত্তরবঙ্গের এক সিংহ পুরুষ আবু সাঈদ রাস্তায় নেমে বলেছিল হয় আমার অধিকার দে না হয় আমাকে গুলি দে। সে ডানা পেতে বলেছিল, ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। রাস্তায় বীরের মতো দাঁড়িয়েছিল। এক এক করে তিনটি গুলি করে খুন করা হয়েছে। একটা গুলিও সে পিঠে নেয়নি, তিনটি গুলিই সে বুকে নিয়েছিল।
জামায়াত আমীর বলেন, আপসোস! যারা সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী জাহেলিয়াতের যাঁতাকলে পিষ্ট ছিলাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, আলেম-উলামা, সাংবাদিক বন্ধু, সুশীল সমাজের সদস্য, কৃষক-শ্রমিক যারাই ছিলাম এর মধ্যে একটা অংশ এই মজলুম অবস্থার পরিবর্তন করে তারা রাতারাতি জালেমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যে সমস্ত অপকর্ম করে আওয়ামী লীগ দীর্ঘসময় এই জাতিকে কষ্ট দিয়েছে। একই অপকর্ম একটা অংশ করা শুরু করে দিলো।
আমরা লক্ষ্য করলাম বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলাবাজি শুরু হয়ে গেল। এখনো অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী বলে আমরা যাবো কোথায়? আমাদেরকে জিম্মি করে আমাদের বিরুদ্ধে মার্ডার মামলা দিয়ে এখন আমাদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছে। দাবি করছে কারা জানেন? সাড়ে ১৫ বছর যারা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্য দেশের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। ফিরে এসে তারাই মামলা-বাণিজ্য করে চাঁদা দাবি করছেন।
তিনি বলেন, আগস্টের ৬ তারিখ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আজ ৮ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের জ্বালায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ফুটপাথে বসে যে ভিক্ষুক ভিক্ষা করে তার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে।
জামায়াত আমীর বলেন, আমাদের সন্তানদের দাবি ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। একটি দল তারা মাঝেমধ্যে বলে তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে। এটা ভালো কথা। এই ভালো কাজটা নিজের ঘর থেকে শুরু করেন। ৫৯ ঋণখেলাপি, ব্যাংক ডাকাতদের আশ্রয় দিয়ে আপনারা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়বেন এটা আদৌ সম্ভব না। জনগণ এটা বুঝে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের টাকা লুণ্ঠন করে যারা বিদেশে পাচার করেছেন। এটা তাদের টাকা নয়, এটা ১৮ কোটি মানুষের টাকা। রাষ্ট্রের আয়ের খাত তিনটি- ট্যাক্স, বিদেশি অনুদান এবং বিদেশি ঋণ। এই তিনটি মিলিয়ে রাষ্ট্রের তহবিল। আমরা কথা দিচ্ছি যদি ১৩ই ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন বাংলাদেশ হয়, তাহলে নতুন বাংলাদেশের এই প্রাপ্য ষোলআনা আদায় করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবো ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, একটি কথা আল্লাহতায়ালাকে সাক্ষী রেখে বলবো মানুষের জীবন, সম্পদ এবং ইজ্জত এই তিনটির পাহারাদার হবো। যারা এমপি হবে তারা প্রতি বছর তাদের পরিবারের সদস্যসহ পারিবারিক সম্পদের হিসাব জনগণের সামনে দিতে বাধ্য হবে। আমাদের দেশে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জতের কোনো নিরাপত্তা নেই। ঘরেও নেই, রাস্তায়ও নেই এবং কর্মস্থলেও নেই। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
যুবকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, যুবক বন্ধুরা তোমরা তৈরি হয়ে যাও বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য। আমরা বিশ্বাস করি যুবকরা বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না। এ দেশের মানুষ মেধাবী এবং পরিশ্রমী। অতীতের নেতৃত্বের মধ্যে সততার অভাব ছিল। তাদের মধ্যে দুর্নীতির হাত বন্ধ রাখার শপথ ছিল না। দেশের প্রতি দায় ছিল না। এজন্য বাংলাদেশ আগাতে পারেনি। আমরা আশা করবো যুবকরা আমাদেরকে হতাশ করবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নাহিদ আপনাদের এলাকার সন্তান। আমি মায়ের কাছে মাসির কথা বলতে চাই না। আমার চাইতে নাহিদকে আপনারা ভালো চিনেন। কিন্তু এটা বলতে চাই, ইনসাফের পক্ষে জনগণের রায়, আল্লাহর মেহেরবানিতে যদি অর্জিত হয়-তাহলে সেই সরকারে অবশ্যই নাহিদ ইসলামকে আপনারা একজন মন্ত্রী হিসেবে দেখতে পাবেন।
এই জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের আমরা মনে করি ৫টি বছরই যথেষ্ট। আমরা এমন কোনো আশ্বাস আপনাদেরকে দিবো না যেটা এখানে নেই। যেটা এখানে আছে সেটারই আশ্বাস দেবো। যা বলবো ইনশাআল্লাহ জান-প্রাণ দিয়ে সেটাই করার চেষ্টা করবো।
আসুন, একটা বেইনসাফমুক্ত, জুলুমবাজমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দখলবাজমুক্ত, মামলাবাজমুক্ত আধিপত্যবাদমুক্ত ইনসাফের মানবিক বাংলাদেশ গড়তে আমরা হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।
জনসভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হকসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখন।
ওদিকে জামায়াত আমীর পরে নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগে নামেন। দল ও জোটের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চান।
