ভারতীয় জাহাজে ইরানের হামলার দায় তেহরানের ওপর চাপালেন ট্রাম্প, কিন্তু ক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই

ভারতীয় জাহাজে ইরানের হামলার দায় তেহরানের ওপর চাপালেন ট্রাম্প, কিন্তু ক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ এনে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ত্যাগকারী ভারতীয় জাহাজগুলোর ওপর সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার জন্য তেহরান দায়ী। তবে তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতজুড়ে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন সামরিক অভিযান, যাতে তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প শুক্রবার তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরান যে গত রাতে হরমুজ প্রণালি ছেড়ে যাওয়া ভারতীয় জাহাজগুলোর ওপর ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে এবং তা প্রতিহত করা হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাদের দ্রুত নিজেদের আচরণ ঠিক করতে হবে।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে নয়াদিল্লি দ্বিতীয়বারের মতো ভারতে নিযুক্ত একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিককে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। তবে ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর বিষয়ে ট্রাম্প কোনো দুঃখ প্রকাশ বা মন্তব্য করেননি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।

ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওমান উপসাগরে ভারতীয় নাবিক থাকা একাধিক তেলবাহী জাহাজে মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো পালাউ-পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এমটি সেট্টেবেলো’তে হামলা। এই হামলায় তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। ঘটনাটি ভারতজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া এমটি মারিভেক্স নামের আরেকটি জাহাজেও মার্কিন বাহিনীর হামলার অভিযোগ রয়েছে। ওই জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাবিককে পরে ওমানের উদ্ধারকারী বাহিনী নিরাপদে সরিয়ে নেয়। আর এমভি জলবীর নামের আরেকটি জাহাজেও হামলার খবর পাওয়া গেছে, যদিও সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা কী?

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম জানিয়েছে, এসব ছিল ‘নির্ভুল সামরিক অভিযান’। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো ইরানি তেল বহনের সন্দেহে নজরদারিতে ছিল এবং মার্কিন নৌবাহিনীর নির্দেশনা অমান্য করেছিল। মার্কিন বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থেকে উড্ডয়ন করা একটি এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান জাহাজগুলোর ইঞ্জিন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষে নির্ভুল অস্ত্র নিক্ষেপ করে সেগুলোকে অচল করে দেয়। তবে ভারতের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বেসামরিক নাবিক বহনকারী জাহাজে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ কতটা ন্যায়সঙ্গত ছিল।

ট্রাম্পের নতুন অভিযোগ

এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া ভারতীয় জাহাজগুলোর ওপর ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছিল, যা প্রতিহত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজের দিকে ধেয়ে আসা একাধিক ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান

ভারত ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনে কড়া বার্তা পাঠিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেসামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগকে গভীর উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছে এবং আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। ভারতীয় রাজনৈতিক মহলেও দাবি উঠেছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিষয়টি সরাসরি ট্রাম্পের সামনে তুলতে হবে।
এই ঘটনাগুলো এমন এক বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি পক্ষ না হয়েও ভারতীয় নাবিকরা যুদ্ধের শিকার হচ্ছেন। একদিকে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ভারতীয় জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলছেন, অন্যদিকে ভারতীয় নাগরিকদের প্রাণহানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধেই নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ফলে কূটনৈতিক প্রশ্নটি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে: ভারত কি শুধুই আঞ্চলিক সংঘাতের অনিচ্ছাকৃত ভুক্তভোগী, নাকি নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে?

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন