আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে বলে মত দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বাজেটের সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বাস্তবসম্মত ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে প্রাক্কলনগুলো করা হলে বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা অনেক বেশি সুদৃঢ় হতো। গতকাল রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডি’র পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সাফল্য এর আকারের ওপর নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হলেও কাক্সিক্ষত ফল পেতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটের ইমপ্লিসিট ফিলোসফি হলো- মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা বিকাশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতে বিশেষ গুরুত্ব।
সংস্থাটির মতে, বাজেটের এই দৃষ্টিভঙ্গি বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বাচনী অঙ্গীকারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের ওপর যে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল, বাজেটেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মানব উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সিপিডি বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি প্রক্ষেপণ বা পথরেখা দেয়া হয়েছে। যেমন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা একরকম থাকলেও ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা হবে ৪ লাখ টাকা। পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এই সীমা বাড়িয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। করের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা থাকা একটি ইতিবাচক দিক। ফলে করদাতারা আগে থেকেই জানতে পারেন যে কতো আয় করলে কতো টাকা কর দিতে হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ খরচ ও আর্থিক পরিকল্পনায় সাহায্য করে।
করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান বাজার দরের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে এই সামান্য বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই করমুক্ত আয়ের সীমাটা আসলে বর্তমানে যে এত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সেটাকে কতোখানি আমলে নিতে পেরেছে? করমুক্ত আয়ের সীমাটা আরেকটু বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে।
বরাবরের মতোই অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকার বিষয়ে বলেন, কালোটাকা সাদা করার এই সুযোগ করের ন্যায্যতা নষ্ট করে। যারা নিয়মিত ও সততার সঙ্গে কর দিয়ে আসছেন, তাদের সঙ্গে এটি একধরনের চরম বৈষম্য।
বাজেট পর্যালোচনা প্রকাশের পর এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার বড় ম্যান্ডেট ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে বাজেটে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বাজেটে আমদানি প্রতিস্থাপক ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে শুল্ক, এইচডি ও এআইটির মতো কর বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন শুল্কহার কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পদ ও আয়ের পুনর্বণ্টনের চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক যানবাহন, সোলার প্যানেলসহ পরিবেশবান্ধব খাতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েই মূল প্রশ্ন রয়েছে।
সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের প্রথম ঝুঁকি হচ্ছে- সরকারের প্রাক্কলনের ভিত্তি। সম্পদ আহরণ, বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, রপ্তানি-আমদানি কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধি- সব ক্ষেত্রেই যে ভিত্তির উপর হিসাব দাঁড় করানো হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় এক দশমিক ৮ শতাংশ নেতিবাচক অবস্থানে থাকলেও বাজেটে বছর শেষে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে। আবার মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি থাকলেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া সম্পদ আহরণে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ এবং প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সিপিডি’র এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য বাস্তবসম্মত ভিত্তি নির্ধারণ করা আরও সহজ ছিল। কারণ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সরকার আগের সময়ের নানান প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার উত্তরাধিকার পেয়েছে। তাই সেসব বাস্তবতা স্বীকার করে আরও বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপর বাজেট প্রণয়ন করলে তা অধিক গ্রহণযোগ্য হতো। বাজেট পরবর্তী এই সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি’র গবেষকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
