আমার দেখা ছয় বিশ্বকাপ

আমার দেখা ছয় বিশ্বকাপ

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কাতারের আসরটি ছিল অবিস্মরণীয়। অন্তত আমার কাছে। আরব দেশগুলোতে একটা বিশ্বকাপ হতে পারে বা মধ্যপ্রাচ্যে হতে পারে- এটা কেউই বিশ্বাস করতো না। এতো গরমের মধ্যে কীভাবে সম্ভব! তবে কাতার তা প্রমাণ করেছে। এর আগে আমার দেখা পাঁচটা বিশ্বকাপে যা আমি দেখিনি তারচেয়ে বেশি দেখেছি কাতারে। এই বিশ্বকাপে ইতিহাস সৃষ্টি হয়। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি শুট আউটে ভাগ্য নির্ধারণ হয়। এটা কিন্তু সাধারণ বিষয় নয়। মজার ঘটনা হচ্ছে যে, বিশ্বকাপে এমন তিন তিনটি ফাইনালেরই সাক্ষী আমি। প্রথমবার যেটা দেখেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে ’৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে। রবার্তো ব্যাজিও টাইব্রেকারে পেনাল্টি শট মিস করেন। প্লেয়ারদের এটা হয় স্নায়ুচাপ থাকার কারণে। ইতালি চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরার কৌশলী ফুটবল ও কার্লোস ডুঙ্গার নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল।

পরে ২০০৬ বিশ্বকাপে সেই পেনাল্টি শুট আউটেই জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা হাতিয়ে নেয় ইতালি। মাঠে বসে উপভোগ করেছিলাম সেই ফাইনালের রোমাঞ্চ। ওই ফাইনালে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঢুস মেরে লাল কার্ড দেখেন জিদান। অনেকেই মনে করেন জিদান লাল কার্ড না পেলে শিরোপা জিততো ফ্রান্সই। কারণ ওই সময় ফরাসিদের দিকে ছিল ম্যাচের মোমেন্টাম।

যাই হোক, কাতার বিশ্বকাপের আয়োজন ছিল চমৎকার। একটা ছোট এরিয়ার মধ্যেই স্টেডিয়ামগুলো। যোগাযোগ ব্যবস্থা অসাধারণ। চিন্তাও করা যায় না। বিশেষ করে বুলেট ট্রেন এবং মেট্রো রেল এমনভাবে সংযোগ স্থাপন করেছিল যেখানে কোথাও কারও সমস্যা হয়নি। খেলা শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে স্টেডিয়ামগুলো মোটামুটি খালি হয়ে যায়। শহর ছোট হলেও জায়গাটা অনেক বড় ছিল। এতে কারও অসুবিধা হয়নি। আয়োজকরা খুব কেয়ারিং। সাংবাদিকদের খোঁজ নিয়েছেন। মিডিয়া সেন্টারটা ছিল আমার দেখা অন্য মিডিয়া সেন্টারগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রম। বিশাল একটা বিল্ডিংয়ের মধ্যে। আমি আগের পাঁচটা বিশ্বকাপে এমন দেখিনি। আগে টেন্টের মধ্যে দেখেছি মিডিয়া সেন্টার। বিষয়টি ছিল কাতারের ইমেজের। খেলা শুরু হওয়ার আগে কাতার বিশ্বকাপ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। বিশেষ করে শ্রমিকদের মানবাধিকার নিয়ে। তবে খেলা শুরু হওয়ার পর এসব আর কারও মনে আসেনি। পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যম সন্দেহ প্রকাশ করেছিল কাতারের ধর্মীয় সামাজিক আবহে ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে আগত ফুটবল সমর্থকরা বিশ্বকাপটা উপভোগ করতে পারবে কিনা। কিন্তু আমি নিজে দেখেছি, রাত দেড়টা-দু’টা পর্যন্ত ফুটবল সমর্থকরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলার কোনো বাধা ছিল না। ’৯০ বিশ্বকাপে ইতালিতে আমার পকেটমার হয়। ওখানে প্রায় ৫০০ ডলার খোয়া যায়। এমনকি আমার আইডি কার্ডও ওরা ছিনতাই করেছিল। তারপর আমি নতুন করে আবার কার্ড পাই। কাতারে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ঘাটতি ছিল না। সব দিক থেকে চমৎকার। আমার মনে হয়, তারা বাইরের নিরাপত্তা এজেন্সির সহায়তা নিয়েছিল। আসরে কেউ কোথাও কোনো খুঁত পায়নি। পশ্চিমা মিডিয়া চেষ্টা করেছে খুঁত বের করতে কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। মজার ঘটনা হচ্ছে কাতারে আমি যেটা দেখেছি বাইরে প্রচণ্ড গরম। কিন্তু মাঠে সেই গরমটা টেরই পাওয়া যায়নি। স্টেডিয়ামগুলোও ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। মাঠের জন্য বিদেশ থেকে ঘাস আনা হয়। আসর শেষে তারা প্রমাণ করেছে, যে কোনো বিবেচনায় এটা ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ। ফুটবল ইতিহাসে কাতার বিশ্বকাপ অনেক দিক দিয়েই এগিয়ে থাকবে।

’৯৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটা খুব আলোড়ন তুলেছিল। গ্রুপ পর্বে টানা দুই জয়ে দারুণ শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। এক ম্যাচে গোল পান ম্যারাডোনা নিজেও। কিন্তু ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ হওয়ার পর টানা দুই ম্যাচে হেরে (বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া) বিদায় নেয় আর্জেন্টাইনরা। ২০০২ বিশ্বকাপ সেটা আরেক অভিজ্ঞতা। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ আয়োজনে প্রথমবারের মতো এশিয়ায় বিশ্বকাপ। সেই আয়োজনও ছিল চমৎকার। জাপানে এমনিতেই ফুটবল জনপ্রিয়। আর দক্ষিণ কোরিয়ায় ফুটবলটা তাদের কাছে রীতিমতো স্বপ্ন। ফাইনালটাও ছিল টানটান উত্তেজনার। আমি মাঠে বসে দেখেছি। জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। রোনালডো ডি লিমা, রোনালদিনহো, রিভালদো, কাফুদের নিয়ে গড়া দুর্দান্ত একটা দল। কোনো এক্সট্রা টাইম ও বা পেনাল্টি শুটআউট ছাড়াই টানা সাত ম্যাচ জিতে শিরোপা কুড়ায় ব্রাজিল। বিশ্বকাপে এটাও অনন্য নজির। আমি ছ’টা বিশ্বকাপ কভার করেছি।আমরা যখন বিশ্বকাপ কাভার করতে যাই অনেক দেশের সাংবাদিকরাই অবাক হয়। বলে, তোমাদের দেশে তো সেভাবে ফুটবলই নেই!

মজার কথা হলো- কাতার বিশ্বকাপ ছিল আয়তনে ছোট একটা দেশে, ছোট্ট একটা বলয়ে। আর এবারের বিশ্বকাপটা হতে যাচ্ছে বিশাল একটা মহাদেশ জুড়ে। ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত এলাকা নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা যৌথ আয়োজক। আসরের এক ভেন্যু কানাডার ভ্যাঙ্কুভার বিসি প্লেস স্টেডিয়াম থেকে মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামের দূরত্ব ৪৪০০ কিলোমিটার। এটা ভাবাও যায় না। সাংবাদিক ও টিমগুলোর জন্য বেশ কঠিন। আমি জানি না এবার তিন দেশে কেন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বা মেক্সিকো একাও করতে পারতো। তারা আগে এককভাবেই বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। ১৯৯৪-এ যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে আয়োজন করেছিল। আর ১৯৭০ ও ১৯৮৬- মেক্সিকোর দুইবারের অভিজ্ঞতা। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবার মনে ছিল নানা প্রশ্ন। একটা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হচ্ছে এই বিশ্বকাপ। আবহাওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আছে ভিসা জটিলতাও। বিশ্বকাপের ৪৮ দেশের একটি ইরান। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলছে। এখনও থামেনি। ইরানের খেলাগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এখন তাদের খেলাগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে মেক্সিকোতে। এটা একপেশে। আর মেক্সিকোতে নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে বিভিন্ন খবর উঠে আসছে বিশ্ব মিডিয়ায়। আমার নিজেরই মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ কাভার করতে যাওয়ার কথা ছিল। টিকিটও কেটেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছি। আমার বন্ধু-বান্ধবরা আমাকে বলেছে, তোমার মেক্সিকো বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়া ঠিক হবে না। এয়ারপোর্ট থেকেই তোমাকে টার্গেট করে ফেলবে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালো নয়। যদিও আয়োজকরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

এই বিশ্বকাপে কী হবে জানি না। দর্শকের ঘাটতি আছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে বাস্কেটবল, বেসবলের মতো খেলাগুলো বেশি জনপ্রিয়। ফুটবল বলতে তারা আমেরিকান ফুটবলকে (এনএফএল) বোঝে। যা অনেকটা রাগবির মতো। সেখানে এই এনএফএল খুব জনপ্রিয়। আর ১১ জনের ফুটবলকে তারা বলে সকার। যদিও ১৯৯৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের পর মার্কিন মুল্লুকে একটু একটু করে জনপ্রিয়তা বেড়েছে ফুটবলের। যে সব খবর প্রতিদিন দেখছি তাতে আমার মনে হয় নেতিবাচক যদি কিছু না ঘটে তাহলে অন্য একটা ইতিহাস তৈরি হবে। তবে পরিস্থিতিটা নাটকীয়ভাবে যেভাবে মোড় নিচ্ছে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে যদি কিছু ঘটে সেটা হবে দুর্ভাগ্যজনক। যদিও যে কোনো বড় আসরের আগেই নেতিবাচক কিছু খবর আমরা দেখতে পাই। কিন্তু একবার খেলাটা শুরু হয়ে গেলে পুরো পৃথিবী বুঁদ হয়ে যায় তাতে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডায় বিশ্বকাপ শুরু হলেও তেমনই কিছু একটা হবে বলেই আমার বিশ্বাস। মানুষ ইতিবাচক বিষয়গুলোই দেখতে চায়। বিশ্বকাপ উপভোগ করতে চায়। এই সময়টায় পুরো পৃথিবী গ্লোবাল ভিলেজের মতো হয়ে যায়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আমার ধারণা এবারের বিশ্বকাপে ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে। ফ্রান্সের সাপোর্টারও খুব বেড়েছে। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সাপোর্টার এই মুহূর্তে এক নম্বরে। যদিও একটা সময় ব্রাজিলের সমর্থকই ছিল বেশি। ম্যারাডোনার কারণে আর্জেন্টিনার সমর্থক বাড়তে থাকে। এবারের বিশ্বকাপে খেলবে ৪৮টি দল। এতে কিছু ম্যাচ নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমতে পারে। টিকিটের দাম অনেক ক্ষেত্রে আকাশছোঁয়া। বাসস্থানটা বড় ধরনের সমস্যা। কেমন হবে এবারের লড়াই? একদিকে বৈরী আবহাওয়া। অন্যদিকে প্রচণ্ড গরম। রাজনৈতিক প্রভাবতো আছেই।

মেসি, রোনালদো ও নেইমারের এটি শেষ বিশ্বকাপ। পরের সুপার স্টার কে? কিলিয়ান এমবাপ্পে? বিশ্বের দৃষ্টি তার দিকে। যদিও তাকে এখন আর নতুন তারকা বলা যায় না। এবার নতুন কোনো সুপারস্টার বেরিয়ে আসতে পারে। স্পেনের লামিন ইয়ামাল, জার্মানির ফ্লোরিয়ান ভির্টজরা আলো ছড়াতে পারেন। অথবা অন্য কেউ আসতে পারেন চমক নিয়ে। আর ইংল্যান্ডকে নিয়ে প্রত্যেকবারই আলোচনা হয়। অধিনায়ক হ্যারি কেইন ফর্মে আছেন। জার্মানির দল বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে গোলের পর গোল করে চলেছেন। কিন্তু জাতীয় দলে এসেই অনেকটা ফ্লপ। এখানে বাকি খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যের ব্যাপার রয়েছে। যদিও জুড বেলিংহ্যামের মতো তরুণ খেলোয়াড়রা ইংলিশদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ইতালি কোয়ালিফাই করতে পারলো না- এটা বেশ দুঃখজনক। তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ফুটবল ঐতিহ্য। তারা বিশ্বের অন্যতম ফুটবল নেশন। ইতালি বিশ্বকাপ দিয়েই আমার অভিযানের শুরু হয়।

১৯৯০-এ প্রথমবার বিশ্বকাপ কাভার করেছিলাম ইতালিতেই। সেটা একটা স্মরণীয় অধ্যায়। তখন দৈনিক ইত্তেফাকে আমি কূটনৈতিক রিপোর্টার। খেলার প্রতি আমার খুব আকর্ষণ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাকে দেখেছি। আমার বারবারই মনে হতো আমি কি বিশ্বকাপে যেতে পারবো? নানা চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ থেকে কোনো রিপোর্টার ফিফা বিশ্বকাপ কাভার করতে যাবে এটা তখন অবিশ্বাস্যই ছিল। তবে আমি ভারতে ১৯৮৭’র ক্রিকেট বিশ্বকাপ কাভার করেছিলাম। গোলাম সরওয়ার ভাই তখন ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক। পরে সমকালের সম্পাদক হয়েছিলেন। তিনি আমাকে উৎসাহ দিলেন। আর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভাই বললেন- যত টাকা লাগে, আমি বলে দিচ্ছি। ক্রিকেট বিশ্বকাপ কাভার করা প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিকও আমি। ফুটবল বিশ্বকাপেও তাই। প্রথমবার ফিফা বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়াটা ছিল স্বপ্নের মতো। তখন ইত্তেফাকের ১১’র পাতায় সিঙ্গেল কলামে ছাপা হতো খেলার খবর। তবে আমার রিপোর্ট টানা ২৮ দিন লিড হয়েছিল। আমাদের বদি ভাই (প্রয়াত বদিউজ্জামান) ছিলেন স্পোর্টস এডিটর। ইতালিতে কীভাবে যাব।একদিকে ভিসা সংকট। অন্যদিকে অর্থ। টাকা ঠিকই যোগাড় হলো। কিন্তু সমস্যা হলো অ্যাক্রিডিটেশনের। বাংলাদেশের জন্য অ্যাক্রিডিটেশন বরাদ্দই ছিল না। আমি যেহেতু কূটনৈতিক বিটে কাজ করতাম অফিস থেকে চিঠি নিয়ে যাওয়ার পর অ্যাম্বাসেডর ওয়ালিউর রহমান হেল্প করলেন। মিডিয়া সেন্টারে যাওয়ার পর অ্যাম্বাসেডরকে ফোন করে বলা হলো, এক্সিলেন্সি। আপনি সুপারিশ করেছেন। কিন্তু আপনার দেশের নাম তো তালিকাতেই নেই। যাইহোক, আমরা অ্যাক্রিডিটেশন দিচ্ছি। আমারতো তখন আনন্দের অন্ত নেই। ছাড়পত্র পেয়ে গেলাম। ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও অ্যাক্রিডিটেশন ছাড়াই গিয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরে অ্যাক্রিডিটেশন পেতে সাহায্য করেছিলেন জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তখন কাগজও ছিল হাতেগোনা। ইত্তেফাক ছাড়া কেউ সাহস করতো না। এখন অনেক সাংবাদিক যায়, কাভার করে। সেটা ভালো লাগে। কিন্তু ফুটবল কাভার করা বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ, আপনাকে দেখতে হবে ওরা কী করছে। যেমন স্প্যানিশ জার্নালিস্টরা। বলা চলে ওদের হাতেই নিয়ন্ত্রণ।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল হোক অথবা স্পেন। নেপথ্যে ওরাই সব। ওদের জার্নালিজমের ধরনও ভিন্ন। ওরা বের করে নিয়ে আসে কীভাবে একজন খেলোয়াড়কে মানুষের সামনে উপস্থাপন করবে। আমাদের এখানে তো ভাসা ভাসা রিপোর্ট করি আমরা। আসল খেলাটা হয় অনুশীলনে। খেলা এবং দল কেমন সাজানো হচ্ছে সেখানেই বোঝা যায়। সেখানে ঢোকা যায় না সত্য, কিন্তু তারা খুব লেগে থাকে। এটাও ঠিক তাদের এক একটা পত্রিকায় ছয় সাতজন করে সাংবাদিক কাজ করে। আমাদের নিজেদের দেশ ফুটবল বিশ্বকাপে খেললে অন্যরকম হয়ে যেতো। ৪৮ দেশের বিশ্বকাপে তাদের পরিকল্পনা ছিল এশিয়া থেকে আমাদের প্রতিবেশী দেশ কোয়ালিফাই করবে। কিন্তু তারা পারেনি। বিশ্বাস ছিল, এটা হতে পারতো। আমি জানি না আমাদের কবে কী হবে। তবে কিছু প্রবাসী ফুটবলারের আগমনে এখন একটু ইতিবাচক পরিস্থিতি বাংলাদেশের ফুটবলে। এক হামজা চৌধুরী খুব বেশি কিছু করতে পারবেন না। আপনাকে খেলোয়াড় তুলে আনতে হবে। পাইপলাইন সমৃদ্ধ করতে হবে। তৃণমূলে ফুটবল ছড়িয়ে দিতে হবে। স্কিল নেই কেন, দমের সংকট কেন, কীভাবে বেড়ে ওঠে প্লেয়ার- সেটাও দেখতে হবে। ফুটবলে আমাদের সম্ভাবনা ছিল। কাছ থেকে দেখেছি। আমি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সহসভাপতি ছিলাম। আমাদের ফুটবলে ঘনঘন কোচ পরিবর্তন করাটা আত্মঘাতী। কোচ বদলে লাভ হবে না। দলাদলি, গ্রুপিং, জেলা প্রীতি, পছন্দ-অপছন্দ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঢাকা স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরে যেতো দর্শকে। মোহামেডান-আবাহনী খেলা হলে দুপুর থেকে স্টেডিয়ামে ভিড় হতো। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের ফুটবলের দৃশ্যটা একটু ফিরেছে। এটা পুরোপুরি ফেরাতে হলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) অনেক তৎপর হতে হবে। জেলায় জেলায় খেলা ছড়িয়ে দিতে হবে। ইংল্যান্ডের কথাই ধরুন। সেখানে পাড়ায়- মহল্লায়ও ফুটবল টিম আছে। তবে আমাদের সামনে এখনও অবারিত সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বিশ্বকাপের উন্মাদনাকেও পুঁজি করা যায়। বাংলাদেশের ফুটবলকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে পুরোটা ঢেলে সাজাতে হবে। লাইকিং-ডিসলাইকিং চলবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে- সরকার বদলায়, ফুটবলের নেতৃত্বও পুরোপুরি বদলে যায়। 


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন