গণভোটের প্রচারণায় অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হয়েছে

গণভোটের প্রচারণায় অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হয়েছে

ফন্ট সাইজ:

গণভোটের প্রচারণায় দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতে অবস্থান নেয়ার ফলে সরকার এবং নাগরিকদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া এই বিতর্কের কারণ হিসেবে গণভোটে সরকারের সরাসরি ভূমিকা ও নির্বাচন কমিশনের অপরিণামদর্শী পদক্ষেপকে দায়ী করেছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল বেলা ১১টায় ঢাকার টিআইবি কার্যালয়ে সংস্থাটির প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। টিআইবি’র পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলসমূহের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের দোদুল্যমানতা ও উভয়পক্ষের সন্তুষ্টি প্রত্যাশী অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা শুরুতেই গণভোটের বিষয় ও প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট এবং সংসদে উচ্চকক্ষ বিষয়ক বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত যদি উক্ত সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় বিবেচনা করা হয়েও থাকে, তবুও বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। এমন বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, বিশেষ করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো প্রকার গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয়ের সুযোগ নেয়া হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।

টিআইবি বলছে, সরকারের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচার সম্পর্কে যে নির্দেশনা নির্বাচন কমিশন দিয়েছিল তা কতোটুকু সুচিন্তিত, আইনসম্মত ও গঠনমূলক, এসব প্রশ্নের কারণে আরও অধিকতর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় নির্বাচন ও গণভোটের সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ২(৭) অনুযায়ী ‘নির্বাচন অর্থ এ আদেশের অধীন কোনো সদস্যের আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন’। অর্থাৎ কোনোভাবেই গণভোটকে নির্বাচনের সমার্থক বিবেচনার সুযোগ নেই, গণভোটে ভোটার কোনো আসনে বা কোনো সদস্যের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেয় না। টিআইবি পর্যবেক্ষণের আলোকে জানিয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারির আগে গণভোট অধ্যাদেশ প্রণেতা হিসেবে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন আলোচনার সুযোগ নিলে তার স্বাধীন ভূমিকার চর্চা প্রশ্নবিদ্ধ হতো না, বরং অযাচিত বিভ্রান্তি পরিহার করা সম্ভব হতো।

জুলাই অভ্যুত্থান প্রদত্ত ম্যান্ডেট অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের মূল অনুঘটক জুলাই সনদের ওপর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন সরকারের দায়িত্ব। এ ভূমিকা পালনে নির্বাচন কমিশন একমত না হওয়ার কোনো আইনগত বা যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না। তবে এ দায়িত্ব পালনে শুরু থেকেই সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি এনজিও ও ব্যাংক সহ বিভিন্ন অংশীজনের ওপর অযাচিতভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে সরকার নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোট পরিচালনার অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন। বিশেষ করে তফসিল ঘোষণার পর থেকে যেহেতু সরকারি কর্মচারীগণ আইনত নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বাধীন, সরকার তার কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা যৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও নির্দেশনা প্রদানের আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি না নিয়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে অহেতুক হস্তক্ষেপ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশন তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রে আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন এবং অনিয়ম ঘটলেও ইসি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যা পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই অস্পষ্ট অবস্থানে ছিল। একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেন, ইসি গণভোটকে ‘নির্বাচন’-এর সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করছে, যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী সঠিক নয়। কারণ গণভোটে কোনো ব্যক্তি বা আসনের পক্ষে ভোট প্রদান করা হয় না।

জামায়াত নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে না, সেটা ন্যক্কারজনক হলেও প্রত্যাশিত ছিল সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, জামায়াত ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একজন নারীকেও প্রার্থিতা দেয়নি তারা। কিন্তু যাদের থেকে আশা করেছি তারাও দেয়নি। নারী প্রার্থী ইস্যুতে জামায়াতের সমালোচনা করলেও অন্য দলগুলোর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় দলটি মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যান্য দলগুলোরও একই অবস্থা। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, যাদের জন্মলগ্ন থেকেই নারীরা ছিল তাদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি দেখুন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন