জলবায়ু সংকট শ্রম স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ

আলোচনা সভায় অভিমত

জলবায়ু সংকট শ্রম স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ

ফন্ট সাইজ:

জলবায়ু সংকট এখন শ্রম, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ (এনএজেটিবি)-এর গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ অভিমত জানান। এনএজেটিবি ও সাসটেইনেবল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন (এসএমইপি) প্রোগ্রামের সহযোগিতায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে “জলবায়ু সংকট ও কাজের ভবিষ্যৎ: টেকসই ও ন্যায্য বাংলাদেশের পথে যাত্রা” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয় গতকাল সোমবার।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশের নির্বাহী সমন্বয়ক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ-এর সদস্যবৃন্দ, জাতীয় ও খাত ভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনের প্রতিনিধি, পরিবেশ অধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব, যুব এবং নারী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ববৃন্দ।

আলোচনার শুরুতে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রাইসুল ইসলাম খান বলেন, জলবায়ু সংকট এখন কেবল পরিবেশগত নয়, এটি শ্রম, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আলোচনায় উপস্থাপনা তুলে ধরেন বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ)-এর প্রোগ্রাম অফিসার মোঃ জুবায়ের আলম।
উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে। ২০২৬ সালেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে অবস্থান করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে যে জুন-আগস্ট ২০২৬ সময়ে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ, যা দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়াবে।

আরও উল্লেখ করা হয়, চরম তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ সংকট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শ্রমজীবী মানুষ ভয়াবহ কর্মপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমিকদের মধ্যে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে পড়া ও কিডনি জটিলতার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২৫ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এর ফলে প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ।

আলোচনায় আরও জানানো হয়, কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ক্ষতি এবং প্রায় ১০ লাখ সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন বলেন, “বাংলাদেশের শিল্পনীতিতে শুধু উৎপাদনের পরিমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু শ্রমিকদের জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় কার্যত উপেক্ষা করা হচ্ছে।” ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের চেয়ারপারসন কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, “প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবেই।” জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, “People, Profit I Planet—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে শুধু মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। এখন টেকসই উন্নয়ন আর বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজন।”

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু সিসাজনিত বুদ্ধিবিকাশ সমস্যায় ভুগছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ এখনই প্রয়োজন।” বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির কল্পনা আক্তার বলেন, “বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো একদিকে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’র কথা বলে, অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করে না। এই দ্বিচারিতা বন্ধ করতে হবে।” জাস্ট এনার্জি ট্রাঞ্জিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট) এর ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, “নীতিনির্ধারকেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে কার্যকর রূপান্তর সম্ভব নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষিজমির পরিবর্তে অনাবাদি, কম ব্যবহারযোগ্য বা অবক্ষয়িত জমিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতি বছর বৈশ্বিক স্লোগান দেওয়া হলেও শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়। তিনি শ্রমিকদের কষ্ট ও সংকটকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা, জলবায়ু-সহনশীল আবাসন এবং নিরাপদ গণপরিবহনকে যৌথ দরকষাকষি চুক্তির অংশ করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু ফোরামে শ্রমিকদের সুস্পষ্ট দাবি তুলে ধরা, সমন্বিত যৌথ পজিশন পেপার প্রণয়ন এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলসমূহকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা জরুরি।

আলোচনায় বক্তারা কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক তাপ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, নগর সবুজায়ন ও জলাধার পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তারা আরো বলেন, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন ও মানবাধিকার চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সমন্বিত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু-সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক উদাহরণ স্থাপন করতে পারে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন