আবার উত্তাল হয়ে উঠছে ইরান-ইসরাইল পরিস্থিতি। নাজুক যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। এর জবাব না দেয়ার জন্য ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তার কথা রাখেননি নেতানিয়াহু। তারা ইরানের রাজধানী তেহরান এবং তাবরিজ, ইস্ফাহানে বোমা হামলা চালিয়েছেন। এর মধ্যে তেহরান ও ইস্ফাহানে দুটি করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এ হামলায় শহর এলাকাকে টার্গেট করা হয়নি। সোমবার ভোর পৌঁনে চারটায় এ হামলা চালায় ইসরাইল। এর আগে নেতানিয়াহুকে সতর্কতা করে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ইসরাইল যেন ইরানে পাল্টা হামলা না চালায় সেই বার্তা দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যদি ইসরাইল পাল্টা জবাব দেয় তাহলে এই যুদ্ধ নতুন করে শুরু হবে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। তবে তার চেয়েও বড় বিষয় হলো, ট্রাম্প যেকোনো উপায়ে এই যুদ্ধের অবসান চাইছেন।
কারণ, সামনের নভেম্বরে সেখানে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। সেই নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধের কারণে তার জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করছেন, এ কারণে ট্রাম্প যেকোনো উপায়ে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসার পক্ষে। ফলে তিনি ইসরাইলকে সতর্ক করেছেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য চুক্তি অর্জনের যে প্রচেষ্টা তাকে জটিল করে তুলেছে লেবাননে ইসরাইলের হামলা এবং সর্বশেষ ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ শুরু হওয়া। লেবাননের একের পর এক এলাকা দখল করে নিচ্ছে জায়নবাদী ইসরাইল। অকাতরে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। বেসামরিক লোকজনের ওপর নিক্ষেপ করছে মারাত্মক ক্ষতিকর সাদা ফসফরাস। এ নিয়ে এরই মধ্যে তথ্যপ্রমাণসহ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সিএনএন। ইসরাইলে সর্বশেষ চালানো এই হামলার আগের দিন তেহরান সতর্ক করে যে, ইসরাইল যদি আবারও আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এর জবাব দেয়া হবে। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ উপেক্ষা করে ইসরাইল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই হামলা চালানোর পরই ইরানের এই প্রতিক্রিয়া আসে।
ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কায় নিজেদের পশ্চিমাঞ্চলীয় আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ইরাক ও সিরিয়াও সম্ভাব্য ইসরাইলি হামলার আশঙ্কায় তাদের আকাশসীমা বন্ধ করেছে। এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) বলেছে, এ ধরনের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের যদি পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে আমাদের জবাব আরও বিস্তৃত হবে এবং অঞ্চলজুড়ে সব মার্কিন ও জায়নবাদী লক্ষ্যবস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করবে। বিবৃতিতে লেবাননে হামলা এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের উপকূল ও জাহাজের ওপর আক্রমণের কথাও উল্লেখ করা হয়।
পাল্টা জবাবের হুমকি ইসরাইলের
ওদিকে ইসরাইলে বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে। ফলে লাখো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে যায়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, অন্তত তিন দফা হামলায় ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দও শোনা গেছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এই হামলার জবাবে তেল আবিব শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া জানাবে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, ইরান একটি গুরুতর ভুল করেছে। সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির বলেন, নির্দেশ পাওয়া মাত্রই আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে শত্রুর ওপর আঘাত হানব। এ খবর প্রকাশের পর আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ইরানে ওই তিনটি স্থানে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।
ইসরাইলকে ডনাল্ড ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
তবে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে বলেছেন যে, তার মতে ইরানের হামলার জবাবে আর কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন নেই। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসও জানিয়েছে, ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ না করতে এবং কূটনীতিকে আরও সময় দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাবেন। তেহরান জানিয়েছে, বৈরুতে ইসরাইলি হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, বৈরুতে ইসরাইলের হামলার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কোনো সবুজ সংকেত দেয়নি। ইসরাইলকে সংযত রাখার ট্রাম্পের এই প্রচেষ্টা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তার প্রশাসন ইসরাইল-ইরান উত্তেজনা যাতে আরও বৃদ্ধি না পায় এবং তেহরানের সঙ্গে চলমান মার্কিন আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বৈরুতে ইসরাইলি হামলা ও ইরানের হুঁশিয়ারি
ইরান আগে থেকেই সতর্ক করেছে যে, বৈরুতে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে। একই সময়ে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কিছুক্ষণ আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী সতর্ক রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। লেবানন ও ইসরাইল সরকার কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, হিজবুল্লাহ সেই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর বৈরুতের একটি আবাসিক ভবনে ইসরাইলের হামলায় দু’জন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, লেবাননের সর্বত্র সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে যাবে। হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলা ও স্থল অভিযান, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতি- সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে একটি সামগ্রিক চুক্তি অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ইরানের দাবি, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে চলমান সংঘাতেরও অবসান ঘটাতে হবে।
