৪৬ বছর ধরে হেঁটে হেঁটে খবর পৌঁছে দিচ্ছেন গফফার

৪৬ বছর ধরে হেঁটে হেঁটে খবর পৌঁছে দিচ্ছেন গফফার

ফন্ট সাইজ:

স্মার্টফোনের এক স্পর্শে যখন মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে দেশ-বিদেশের সব খবর, তখনো ভোরের আলো ফোটার আগেই কাঁধে পত্রিকার ব্যাগ তুলে নেন এক প্রবীণ মানুষ। শহরের অলিগলি, দোকানপাট, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ আর বাসাবাড়িতে হেঁটে হেঁটেই পৌঁছে দেন দিনের প্রথম সংবাদ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একই ছন্দে চলা এই মানুষটির নাম মো. আব্দুল গফফার ফখরুদ্দীন। সবার কাছে যিনি গফ্‌ফার নামেই বেশি পরিচিত। নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কের শহীদ স্মৃতি অম্লান চত্বরে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলছিলেন, তার চার যুগের পথচলার গল্প।

নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভার মুন্সিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল গফ্‌ফার মরহুম আব্দুল সাত্তারের ছেলে। জীবনের যৌবনকালেই, ১৯৮০ সালে পত্রিকা বিলির পেশায় যুক্ত হন তিনি। দেখতে দেখতে এই পেশায় কেটে গেছে ৪৬ বছর। গফ্‌ফার বলেন, আমি যখন কাজ শুরু করি তখন পত্রিকার সংখ্যা ছিল কম, হকারও ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। প্রতিদিন ভোরে পত্রিকা সংগ্রহ করে বেরিয়ে পড়তাম। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় কিংবা শীত কোনো কিছুই আমাকে থামাতে পারেনি। মানুষের হাতে সময়মতো খবর পৌঁছে দেয়াটাই ছিল আমার দায়িত্ব। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে পত্রিকা সরবরাহ করেন। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কপি জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। তবে প্রযুক্তির বিকাশ আর ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রসারের কারণে আগের তুলনায় ছাপা পত্রিকার বিক্রি অনেক কমে গেছে।

পরিবারের কথাও জানালেন এই প্রবীণ হকার। তার স্ত্রী একজন গৃহিণী। পত্রিকা বিক্রির আয়ে তিন সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি। ইতিমধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং এক ছেলে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। আবেগআপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, এই পত্রিকা বিক্রির টাকাতেই সংসার চালিয়েছি, সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছি। আগে মানুষ কাগজের জন্য অপেক্ষা করতো, এখন মোবাইলেই খবর পড়ে। তাই আয় অনেক কমে গেছে। বয়সও হয়েছে, শরীর আর আগের মতো চলে না। পায়ে হেঁটে কাগজ বিক্রি করা এখন খুব কষ্ট হয়। তারপরও পেটের দায়ে আর এই পেশার প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজটা করে যাচ্ছি। জীবনের বাকি সময়টাও এ পেশাতেই কাটিয়ে দিতে চাই। সৈয়দপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও কথাসাহিত্যিক আব্দুল হাফিজ বলেন, ফখরুলকে ছোটবেলা থেকেই পত্রিকা বিলি করতে দেখছি। সততা, সময়ানুবর্তিতা আর দায়িত্ববোধ দিয়ে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন।

স্থানীয় সাংবাদিক কাজী জাহিদ বলেন, সংবাদপত্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার নেপথ্যের কারিগর হচ্ছেন গফফারের মতো মানুষ। তিনি শুধু একজন হকার নন, সৈয়দপুরের সংবাদপত্র সংস্কৃতির জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে মানুষের পাঠাভ্যাস। কাগজের পাতা ছেড়ে খবর চলে এসেছে মুঠোফোনের পর্দায়। তবুও প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই কাঁধে পত্রিকার ব্যাগ নিয়ে পথে নামেন গফ্‌ফার। বয়সের ভার, কমে যাওয়া আয় আর শারীরিক ক্লান্তি তাকে থামাতে পারেনি। সৈয়দপুরের মানুষের কাছে মো. আব্দুল গফফার ফখরুদ্দীন শুধু একজন পত্রিকা বিক্রেতা নন; তিনি একটি প্রজন্মের স্মৃতি, একটি শহরের সকালের প্রতিচ্ছবি এবং ছাপা সংবাদপত্রের গৌরবময় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন