তামাক প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু, রোগ, দারিদ্র্য এবং জটিল রোগের চিকিৎসায় সরকারি ব্যয়ের একটি প্রধান চালক। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম তামাক ব্যবহারকারী দেশ। প্রায় ৩৫.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহার করেন, যা প্রায় ৩.৭৮ কোটি মানুষের সমান। ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্য, যা ৯.২ শতাংশ। তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ মারা যায় এবং অনেকে পঙ্গু হয়ে পড়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হলেও তামাক ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্যহানি, মৃত্যু এবং পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭,০০০ কোটি টাকা। তামাক একটি বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তামাক ব্যবহারের ফলে অকালমৃত্যুসহ ৩০ টির বেশি কঠিন ও জটিল রোগ হয়, যার মধ্যে রয়েছে ক্যান্সার, হৃদরোগ, মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ ও শ্বাসযন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এর বোঝা শুধু হাসপাতাল এবং রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন কোনো উপার্জনকারী অসুস্থ হন বা অকালে মারা যান, তখন পরিবারগুলো আয় হারায়, শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হয় এবং পরিবারগুলো ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে পারে। দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তামাকের পেছনে খরচের কারণে খাদ্য, পুষ্টি, বাসস্থান এবং শিক্ষার খরচ কমে যায়। বাংলাদেশেও জর্দা, গুল এবং সাদা পাতাসহ ধোঁয়াবিহীন তামাকের একটি বড় ব্যবহারকারী রয়েছে। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীদের অনেকেই দরিদ্র এবং নারী, অথচ মোট তামাক রাজস্বের মাত্র ০.১৫ শতাংশ আসে ধোঁয়াবিহীন তামাক থেকে। এর অর্থ হলো, বর্তমান কর কাঠামো দুই দিক থেকেই ব্যর্থ: এটি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর ব্যবহারকে পর্যাপ্তভাবে নিরুৎসাহিত করে না এবং ক্ষতিকর পণ্যগুলো থেকে যথাযথ রাজস্ব আদায় করতেও ব্যর্থ।
কেন কর ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ:তামাক ব্যবহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে কর ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কাঠামো কনভেনশন (এফসিটিসি)-এর ৬ নং অনুচ্ছেদে স্বীকার করা হয়েছে যে, তামাকের কর ও মূল্য বৃদ্ধি করলে বিশেষ করে তরুণ এবং নিম্ন আয়ের ব্যবহারকারীদের মধ্যে এর চাহিদা কমে। ৬ নং অনুচ্ছেদের নির্দেশিকায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, উচ্চ কর সাধারণত সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি করে এবং একই সাথে এর ব্যবহার কমিয়ে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের তামাক-কর ব্যবস্থাটি অত্যন্ত জটিল। সিগারেটে চারটি মূল্যস্তর রয়েছে: নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ এবং প্রিমিয়াম। যখন কোনো একটি স্তরে কর বা মূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন ধূমপায়ীরা ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে আরও সস্তা স্তরের দিকে চলে যেতে পারে। এটি কর বৃদ্ধির জনস্বাস্থ্যগত প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়। ২০০৬-০৭ সালে নিম্ন স্তরের সিগারেটের বাজার অংশ ২৫ শতাংশ ছিল, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে ৭৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি কর ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা এবং এমন একটি বাজার কৌশলকে প্রতিফলিত করে যা সস্তা সিগারেটকে সহজলভ্য করে রাখে।
বাংলাদেশে তামাকপণ্যের সাশ্রয়ী মূল্য একটি বিরাট সমস্যা। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ২৭ থেকে ৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম মাত্র ৬ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় সিগারেট প্রকৃত অর্থে অনেকটা সস্তা হয়ে গেছে। এটি তরুণ এবং স্বল্প আয়ের ব্যবহারকারীদের জন্য বিপজ্জনক, কারণ তামাক সাশ্রয়ী মূল্যে থাকলে তাদের ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার বা নতুন করে ব্যবহার শুরু করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
সরকারের কেন তামাক ব্যবসা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত: বাংলাদেশ সরকারের তামাক কোম্পানিতে শেয়ার রাখা বা তাদের পরিচালনা পর্ষদে অংশগ্রহণ করা উচিত নয়। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের নিজস্ব শেয়ারহোল্ডিং পেইজ থেকে দেখা যায় যে, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত “সরকারি” ক্যাটাগরির অধীনে ৯.২১ শতাংশ শেয়ার ছিল। এর বিনিয়োগকারী তথ্যে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ, সাধারণ বীমা কর্পোরেশন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড এবং সরাসরি সরকারি হোল্ডিংয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়েরও তালিকা রয়েছে। এটি একটি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। তামাক ব্যবহার কমানো, জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এফসিটিসি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। একই সাথে একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিতে শেয়ারহোল্ডিং রাষ্ট্রকে তামাক বিক্রি এবং মুনাফায় আর্থিক স্বার্থ প্রদান করে। পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব এই সংঘাতকে আরও গভীর করে। বিএটি বাংলাদেশের পরিচালক প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন অ-নির্বাহী পরিচালক অর্থ বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন, এবং অন্যজন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শীর্ষ সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপকও বিএটি’র পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এফসিটিসি-এর ৫.৩ ধারা অনুযায়ী, পক্ষগুলোকে তামাক শিল্পের বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে জনস্বাস্থ্য নীতি রক্ষা করতে হবে। সুতরাং, সরকারের উচিত বিএটি বাংলাদেশে থাকা শেয়ার পর্যায়ক্রমে বিক্রি করে দেওয়া, পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরকারি খাতের মনোনীত সদস্যদের প্রত্যাহার করা এবং তামাক কোম্পানিগুলোতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, সরকারি তহবিল ও পেনশন তহবিলের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা। মোদ্দা কথা, রাষ্ট্রের স্বার্থ মৃত্যু বিপনন কোম্পানিতে নিয়োজিত থাকলে তামাকের কর ও দাম সংস্কার সফল হবে না, তামাকের ব্যবহারও কমবে না।
২০২৬-২৭ বাজেটের জন্য সুপারিশ: আসন্ন বাজেটটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট, যেখানে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং কর ও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। এজন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। মূল্যভিত্তিক (অ্যাড ভ্যালোরেম) সম্পূরক শুল্কের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালু করতে হবে। মূল্যভিত্তিক ব্যবস্থায়, পণ্যের মূল্যের একটি শতাংশ হিসাবে কর ধার্য করা হয়। এই ব্যবস্থাটি দুর্বল হয়ে পড়ে যখন ঘোষিত মূল্য কম থাকে অথবা যখন কোম্পানিগুলো মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় অংশ মুনাফা হিসাবে রেখে দেয়। প্রতি সিগারেট, প্যাকেট বা ওজনের উপর আরোপিত একটি নির্দিষ্ট কর পরিচালনা করা সহজ এবং সস্তা তামাকজাত পণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণে এটি অধিক কার্যকর।
আগামী বাজেটে বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বজায় রেখে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ৪ টাকা নির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি ও আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মূল্যবৃদ্ধি করাও প্রয়োজন। আসন্ন বাজেটে সিগারেটের স্তর চারটি থেকে কমিয়ে দুটি করার মাধ্যমে আরও জোরালো সংস্কার গ্রহণ করা উচিত। প্রথম স্তরটি হবে একটি “স্ট্যান্ডার্ড স্তর”, যেখানে নিম্ন, মধ্যম এবং উচ্চ স্তরকে একত্রিত করা হবে এবং প্রতি ১০টি সিগারেটের সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য হবে ১৫০ টাকা। দ্বিতীয়টি হবে একটি “প্রিমিয়াম স্তর”, যেখানে প্রতি ১০টি সিগারেটের সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য হবে ২০০ টাকা বা তার বেশি। উভয় স্তরেই বিদ্যমান মূল্যভিত্তিক শুল্কের সাথে একটি নির্দিষ্ট কর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই পদ্ধতি মূল্য ব্যবধান কমাবে, নিম্নমানের পণ্যের দিকে ঝোঁক কমাবে, রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং ধূমপান ত্যাগ করতে সহায়তা করবে।কর সংস্কারে বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ফিল্টার ও নন-ফিল্টার বিড়ির একটি অভিন্ন মূল্য এবং করের হার থাকা উচিত। জর্দা, গুল এবং অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের উপর একটি নির্দিষ্ট ও ওজন-ভিত্তিক কর আরোপ করা উচিত। এই সংস্কারগুলো ছাড়া ব্যবহারকারীরা সস্তা এবং দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত তামাক বাজারেই থেকে যেতে পারে এবং সরকার রাজস্ব হারাতে থাকবে।
ডিজিটাল নজরদারি, ট্যাক্স স্ট্যাম্প সুরক্ষিত করা এবং ঘোষিত খুচরা মূল্য কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে কর প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে হবে। অতিরিক্ত রাজস্বের একটি অংশ অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা, ধূমপান ত্যাগ সেবা, স্বাস্থ্য বীমা এবং দরিদ্র রোগীদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ করতে হবে। এছাড়া বিএটি বাংলাদেশে থাকা সরকারি শেয়ার বিক্রি এবং কোম্পানির বোর্ড থেকে সরকার-সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করতে হবে। প্রজ্ঞার তথ্যচিত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো প্রায় ৫ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীকে ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করতে পারে, ৩ লক্ষ ৭২ হাজারেরও বেশি তরুণকে ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখতে পারে, তামাক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে এবং ৪৪,০০০ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো তামাক-সম্পর্কিত গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ মোকাবিলায় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। তাই নির্বাচনী ইশতেহারে পরিকল্পিত উন্নয়নমূলক অগ্রাধিকারগুলোতে বিনিয়োগের জন্য ইতিবাচকভাবে এ পরামর্শগুলো কার্যকরভাবে বিবেচনা করা উচিত।
লেখক: রিসার্চ ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)।
